সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৫ অপরাহ্ন

ভয়ঙ্কর রক্ত খেলায় আতঙ্কিত জনপদ, থমথমে এলাকা

ভয়ঙ্কর রক্ত খেলায় আতঙ্কিত জনপদ, থমথমে এলাকা

ভয়ঙ্কর রক্ত খেলায় আতঙ্কিত জনপদ, থমথমে এলাকা

ঘাতক রিকসা চালক মোখলেছ কর্তৃক ভয়ঙ্কর রক্তখেলায় আতঙ্কিত দেবীদ্বার উপজেলার রাধানগর গ্রামের জনপদে এখনো থমথমে বিরাজ করছে। দিনের আলোতে বাড়ির লোকজন খুব একটা দেখা না গেলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকজনের উপস্থিতি ছিল সীমিত। স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।

শনিবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে ওই এলাকায় যেয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়। ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। নিহত তিন পরিবারের বেঁচে থাকা কয়েকজন সদস্য ও স্বজনকে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক, হতাশা ও ক্ষোভ দেখা যায়।

মৃত’ নাজমা বেগম (৪০) ঘরে যেয়ে দেখা যায়, নাজমার ছোট ভাই ও হত্যা মামলার বাদী মোঃ রুবেল (২৪) বোনের শোকে কাতর, একটু পর পর চিৎকার করে বোনের পরিবারের ভবিষ্য কি হবে তাই ভাবছেন আর বলছেন, কে এ পরিবারের শিশুদের দায়িত্ব নেবে। সে উপজেলার জাফরাবাদ (মনিপুর) গ্রামের মো: তমিজ উদ্দিন ফকির’র পুত্র। তার ভগগ্নীপতি আহত রিকসা চালক নূরুল ইসলামের অবস্থাও সংকটাপন্ন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৬ জনের মধ্যে আহত নূরুল ইসলামের মা’ মাজেদা বেগম (৬৫) অবস্থাও আরো সংকটাপন্ন। তাকে কুমেক হাসপাতালের ১৫ নম্বর বেডে অক্সিজেন ও সেলাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।

মামলার বাদী রুবেল চিৎকার করে বলেন, ঘাতক মোখলেছ পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশিদার মোখলেছের স্ত্রী রাবিয়া বেগম (৩০), মোখলেছের ভাই মোহাম্মদ হোসেন, তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার, অপর ভাই হারুনের স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তাদেরকে মামলায় আসামি করা হয়নি। তাদের গ্রেফতারপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সকল তথ্য পাওয়া যেত।

তাদের পুলিশ আটক করলেও ছেড়ে দেয়, শুধু তাই নয়, ঘাতক মোখলেছের স্ত্রী রাবেয়া হত্যা মামলার বাদী হয়ে উল্টো আমাদের হয়রানী করছে। আমরা মোখলেছের পরিবারকে ঘরে আটকে আগুনে পুড়িয়েছি এমন অভিযোগ নিয়েও পুলিশ আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, আগুনে পোড়া নয়, অক্ষত ঘর দেখিয়ে নিস্ক্রিতি পাই।

আহত রিকসা চালক নূরুল ইসলামের বড় মেয়ে জান্নাত জানায়, তারা দুই ভাই ও দুই বোন। জান্নাত সকলের বড়, সে রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী, ছোট ভাই নাজমুল হাসান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে আবু নাঈম, সকলের ছোট বোন সানজিদা আক্তার পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। এ অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়া পিতা আর দাদীকে হারালে পরিবারটির করুন পরিনতি দাড়াবে।

জান্নাত আরও জানায়, তার মা’ সাত মাসের অন্তঃস্বত্বা ছিল। মায়ের গর্ভের সন্তান ছিল ছেলে। ঘাতকের রক্তখেলায় তার অনাগত ভাইটিও দুনিয়ার আলো দেখতে পেলনা। ঘটনার সময় আমি স্কুলে ছিলাম। আমার ছোট ভাই আবু নাইম তাকে স্কুল থেকে ডেকে আনে।

নিহত আনোয়ারা বেগমের পরিবারের অবস্থা আরও করুন। আনোয়ারা বেগম (৪৫) ও তার ছোট ছেলে তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আবু হানিফকে (১০) নির্মম ভাবে উপর্যুপুরি কুপিয়ে হত্যা করেছে ঘাতক মোখলেছ।

এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন নিহত আনোয়ারার ছোট মেয়ে নিপা আক্তার। প্রায় ৩ মাস পূর্বে নিপার পিতা ক্যান্সারে আকান্ত হয়ে মারা যান। লেখাপড়া ছেড়ে তার বড় ভাই সিএনজি চালক আলম (১৭) সংসারের হাল ধরেন। তার মা’ও তার বাবার রেখে যাওয়া বেল জালে মাছ ধরে সংসারের সহযোগীতা করতেন। নিপা মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে বানিজ্য শাখায় পড়ে। মেধাবী এ ছাত্রীর লেখাপড়াও এখন বন্ধের পথে। পরিবারের সদস্যরা তাকে এ নাবালিকা বয়সেই বিয়ে দেয়ার কথা ভাবছেন। নিপারা,- মা- বাবা, ৪ বোন ও ২ ভাইয়ের সংসার এখন ফাঁকা। নিপার বড় তিন বোন শিউলি, আকলিমা, কুলসুমের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা থাকেন স্বামীর বাড়িতে।

নিপার বড়বোন শিউলি, আকলিমা, কুলসুম জোর দাবি জানিয়ে বলেন, মোখলেছের মস্তিষ্ক বিকৃত ছিলনা। সুস্থ্য ছিল। ঘটনার আগের রাতে তার বাড়িতে ৪ জন নারী পুরুষ এসেছিল, ওরা কারা কি কারণে এসেছিল? হত্যাকাণ্ড সংগঠনের পূর্বে অর্থাৎ ওই সকালে তার সথে বোরখা পরিহিত মহিলাটি কে ছিল? এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পূর্বে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী দোকানে দা’য়ের অর্ডার কেন দিয়েছিল? দা’ নিয়ে আসার পথে অনেকের সাথে ভালো ব্যবহার কিভাবে করল? এ বিষয়গুলো জানতে ঘাতক মোখলেছের স্ত্রী, ভাই ও দুই ভাইয়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সত্য বেড়িয়ে আসবে।

শিউলি জানায়, ভুল করে মোখলেছ তার ছোটভাই মোহাম্মদ হোসেন’র মেয়ে ফাহিমাকে কুপিয়েছিল। তাই তার বাবা হোসেন ক্ষুব্ধ হয়ে কুমেক হাসপাতালে তার ভাবী রাবেয়াকে তিরষ্কার করে বলেন, তোমার স্বামীর রাতের তর্ক-বিতর্ক শোনেছি। তোমার কাছে জমা রাখা ৩ লক্ষ টাকা ফেরত না দেয়ার কারণেই সে ক্ষুব্ধ হয়ে এ নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে।

শিউলি জানায়, ওই টাকার উৎস কি? তা জানা প্রয়োজন। তবে তাদের এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শি পাওয়া যায়নি। তাছাড়া কেউ মুখ খুলতে চায়না। সবাই আতঙ্কে নিজেদের আড়াল করে রখছেন।

এ ছাড়া ঘটনার ৪ দিন পরও রাধানগর বাসীর আতঙ্ক কাটেনি। ভয়ে-আতঙ্কে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে এমন সংবাদে শনিবার দুপুরে সরোজমিনে একটি হাই স্কুল ও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিথি অনেক কম।
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণে রোববার থেকে শুরু হওয়া পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেষ্টে পরীক্ষা নিয়েও শিক্ষকরা রয়েছেন খুবই উদ্বগ্নি। তাই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় মুখি করতে শিক্ষকরা যোগাযোগ করছে অভিবাবকদের সাথে। রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনিতে ৩২ জন ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে উপস্থিত পাওয়া যায় ১৭ জনকে, চতুর্থ শ্রেনির ৩৬ জনের মধ্যে ৭ জন, তৃতীয় শ্রেণির ৩৪ জনের মধ্যে ৩ জন, দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৮ জনের মধ্যে ১ জন, প্রথম শ্রেণির ৩৩ জনের মধ্যে ৬ জন, শিশু শ্রেণিতে ২৭জনের মধ্যে ৩জন উপস্থিত ছিল।

অপর দিকে ছেচড়াপুকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ৩২ জনের মধ্যে ১০জন, চতুর্থ শ্রেণির ৩১ জনের মধ্যে ৯ জন, তৃতীয় শ্রেণির ২৫ জনের মধ্যে ১১জন, দ্বিতীয় শ্রেণির ২২ জনের মধ্যে ১২ জন, প্রথম শ্রেণির ২৫ জনের মধ্যে ৫জন, শিশু শ্রেণিতে ২২ জনের মধ্যে ১জন শিক্ষার্থী উপস্থিত পাওয়া যায়। রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিলো অনেক কম।

রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: রকিব আহসান ভূইয়া বলেন, এমনিতেই ছেলে ধরা আতঙ্কে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়, এসব গুজবে কান না দিতে বলে শিক্ষার্থীদের যখন স্কুল মুখি করছিলাম, ঠিক সেই মুহুর্তে এমন লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ফলে শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসীরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তীতে ঘাতকের স্ত্রীর কর্তৃক অজ্ঞাত দেড় হাজার লোকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কারণে মানুষজন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে, তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন প্রকার হয়রানি করা হচ্ছেনা।

ছেচড়াপুকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মামুনুর রশিদ জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণে আমরা খুবই উদ্বগ্নি। আতঙ্কিত না হয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অভিবাবকদের অনুরোধ করেও লাভ হচ্ছে না। রোববার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মডেল টেষ্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে, আমারা তাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি এবং তাদেরকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বুঝাচ্ছি।

দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবীন্দ্র চাকমা জানান, আতঙ্কিত না হতে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা এলাকাবাসীকে বুঝিয়েছি এবং কোন প্রকার গুজবে কান না দিতে শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের বুঝানোর জন্য আমরা শিক্ষকদের নির্দেশনা দিয়েছি। শিক্ষকরা সেই ভাবে কাজ করছে, আশা করি দুই এক দিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা স্কুল মুখি হবে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী কুরুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ সারা উপজেলায়ই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে।

উল্লেখ্য গত বুধবার সকাল দশটার দিকে রাধানগর গ্রামের মুর্তুজ আলীর ছেলে রিকসা চালক মোখলেছুর রহমান একটি ধারালো দা ক্রয় করে বাড়িতে এসে আকস্মিক লোকজন এলোপাতারি কুপিয়ে রক্তের হলিখেলা শুরু করে। এতে হতাহত লোকজন বিকৃত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে পড় থাকতে দেখা যায়।

এ সময় প্রতিবেশী নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা আক্তার (৪০), মৃত শাহ আলমের ছেলে আবু হানিফ (১০) এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগম আনু (৪৫) ঘটনাস্থলেই মারা যান। ওই সময় ঘাতক মোখলেছের দায়ের কুপে আব্দুল লতিফ(৪৫), মাজেদা বেগম(৬৫), নুরুল ইসলাম(৫০), রাবেয়া বেগম(৪০), ফাহিমা(১০), জাহানারা বেগম(৫০), লোকমান(১৭) সহ আরো ৭জন আহত হয়।

লোকমান ছাড়া বাকী ৬ জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় ঘাতকের রক্ত খেলার তান্ডব লীলা দেখে স্থানীয় লোকজন মসজিদের মাইকে ঘোষণা করলে বিপুল সংখ্যক জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আটক করে গণপিটুনী দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ঘাতক মোখলেছ মারা যায়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com