রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৫৫ অপরাহ্ন

কাশ্মীর উপত্যকায় শান্তি ফেরাতে কেন্দ্রের চার তাবিজহুমকিতে চামড়া শিল্প: কারসাজিতে সক্রিয় ট্যানারি মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট * পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি ছিল সরকারের

কাশ্মীর উপত্যকায় শান্তি ফেরাতে কেন্দ্রের চার তাবিজহুমকিতে চামড়া শিল্প: কারসাজিতে সক্রিয় ট্যানারি মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট * পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি ছিল সরকারের

হুমকিতে চামড়া শিল্প: কারসাজিতে সক্রিয় ট্যানারি মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট * পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি ছিল সরকারের

পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও চামড়া কেনা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হতো। দলীয় প্রভাব ও পেশিশক্তি খাটিয়ে নেয়া হতো কোরবানির পশুর চামড়া। সেখানে এবার অধিকাংশ এলাকায় ক্রেতাই ছিল না। কোনো কোনো জায়গায় বাকিতেও বিক্রি করা যায়নি। ফলে লাখ লাখ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।

এর আগে দেশে চামড়া নিয়ে এত বড় বিপর্যয় আর হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ট্যানারি মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট, এ খাত নিয়ে সরকারের কোনো পূর্বপ্রস্তুতির অভাব এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা। আর ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে শেষ পর্যন্ত কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে দেশের সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্ট।

জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ শিল্পটিকে শুধু দিয়ে যাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ, নগদ সহায়তা, রফতানিতে প্রণোদনা এবং কর অবকাশসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছে শিল্প মালিকদের। কিন্তু এরপরও এদের চাহিদার শেষ নেই। এবার তারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে পানির দামে চামড়া হাতিয়ে নিতে চেয়েছেন।

চট্টগ্রাম: বন্দরনগরীতে চামড়া নিয়ে এবার বিপাকে পড়েছিলেন কোরবানিদাতারা। একেবারে ক্রেতাশূন্য। ফলে বিক্রি না করে রাস্তায় ফেলে রেখেছেন তারা। এ কারণে এক লাখ চামড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ট্রাকে তুলে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে পুঁতে ফেলেছে। সিটি কর্পোরেশনের বাইরেও জেলার ১৪টি উপজেলার গ্রামে-গঞ্জে ক্রেতা না পেয়ে পশুর চামড়া মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, এ বছর এখানে সাড়ে পাঁচ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এরমধ্যে তিন লাখের কিছু বেশি চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। শতাংশ হিসাবে যা ৬০ শতাংশ। বাকি প্রায় দেড় লাখ চামড়া বিভিন্নভাবে নষ্ট হয়েছে। প্রতিটি চামড়ার বাজার মূল্য ৫০০ টাকা ধরা হলেও পুঁতে ফেলা চামড়ার দাম কমপক্ষে সাড়ে সাত কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী এর দাম বহুগুণ বেশি। চামড়া নিয়ে এ ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি অতীতে আড়তদার ও ব্যবসায়ী এবং কোরবানিদাতা কেউই হননি। ৫-৭ বছর আগেও চামড়া নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি অবস্থা ছিল। এবার কেন এমন বিপর্যয় হল তা কেউ আন্দাজ করতে পারছেন না। তারা বলছেন, চামড়া নিয়ে সরকারের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা পরিকল্পনা না থাকার কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামের আড়তদাররা বলছেন, পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে এবার ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করবেন না তারা। আজ রোববার বিকালে এ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্যানারি মালিক ও আড়তদার সমিতির প্রতিনিধিদের বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের পাওনা ৫০ কোটি টাকা কীভাবে পরিশোধ করা হবে এবং কীভাবে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেই কেবল তারা চামড়া বিক্রি করবেন ট্যানারি মালিকদের কাছে। অন্যথায় তারা চামড়া মজুদ করে বিকল্প চিন্তা করবেন।

সূত্র জানায়, প্রতি বছর বকেয়া করতে করতে বিপুল অঙ্কের টাকা আটকে ফেলেছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। বারবার তাগাদা দেয়া ও অনুরোধ সত্ত্বেও ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চট্টগ্রামের আড়তদারদের পাওনা টাকা পরিশোধ করেননি। যে কারণে চামড়া সংরক্ষণের উপকরণ লবণ মজুদ করতে না পারা, শ্রমিকের টাকা পরিশোধ করতে না পারার ভয়, সর্বোপরি নতুন করে টাকা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি মুক্ত থাকতেই আড়তদাররা প্রয়োজনের তুলনায় কম চামড়া কিনেছেন।

রাজশাহী : এবার পানির দরে কোরবানি পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। আকারভেদে গরুর চামড়া একশ’ থেকে চারশ’ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন চামড়ার দাম এটি। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামেই তারা চামড়া কিনেছেন। কিন্তু সেই চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে দাম পাননি। সিন্ডিকেট করে চামড়া ব্যবসায়ীরা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সংকটে ফেলেছেন। তাদের মতে, দাম কমিয়ে শুধু মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সংকটে ফেলেননি, সংকটে ফেলেছেন এখানকার মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোকে। যারা প্রতিবছরের মতো এবারও চামড়া সংগ্রহ করেছিল। দাম না পাওয়ায় চরম বেকায়দায় মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। ফলে পানির দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। আর বঞ্চিত হয়েছে গরিব-মিসকিনরাও।

যশোর : ঈদের পরদিন যশোরের রাজারহাট প্রায় ক্রেতাশূন্য থাকলেও শনিবার দ্বিতীয়দিনের হাট ছিল ক্রেতা-বিক্রেতায় সরগরম। তবে সেই তুলনায় চামড়ার জোগান ছিল না। ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করলেও চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। শনিবার ঈদের পরের প্রধান হাটেও চামড়ার দাম কম। হাটে চামড়াও উঠেছে অল্প পরিমাণ।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, চামড়া রফতানির সরকারি ঘোষণার পর পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় সেটা পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যেই ব্যবসায়ীদের অনেকে এ হাটে বেচাকেনা থেকে বিরত থেকেছেন। এছাড়া ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বকেয়া টাকা না দেয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চামড়া কিনতে পারেননি তারা। বিক্রেতারা বলছেন, সরকার চামড়া রফতানির ঘোষণা দেয়ায় দরের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশা করলেও এ হাটে এসে হয়েছেন আশাহত। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা যে দামে কিনতে বলছেন বাজারে সেই দামে চামড়া মিলছে না। ফলে লোকসান গোনার শঙ্কায় তারাও। সাতক্ষীরা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ী আসাদুল ইসলাম ৯০ পিস চামড়া নিয়ে রাজারহাটে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। মাত্র ১৪ পিস চামড়া তিনি বিক্রি করেছেন। এবার চামড়ায় তার অনেক টাকা লোকসান হবে। লবণ, পথ ও লেবারের খরচ উঠছে না।

সিলেট : নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অবিক্রীত প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া ফেলা হয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) ভাগাড়ে। কোরবানিদাতা ও বিভিন্ন মাদ্রাসা এসব চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেন। এসব চামড়া থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে নগরীর বিভিন্ন এলাকাতে। পরে সিসিক নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব পরিত্যক্ত চামড়া সংগ্রহ করে তা সিসিকের নির্ধারিত ময়লা ফেলার স্থান পারাইরচকে পুঁতে ফেলে। প্রতিবারের মতো এবারও কোরবানিতে নগরী ও নগরীর বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পশুর চামড়া সংগ্রহ করে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দিনশেষে এর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়।

জানা গেছে, সিলেটে ব্যবসায়ীরা প্রতি পিস চামড়ার দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। এমনকি অনেক ব্যবসায়ী বাকিতে চামড়া কিনতেও রাজি না হওয়ায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ রাস্তায় চামড়া ফেলে প্রতিবাদ করে। পরে চামড়াগুলো ময়লার সঙ্গে তুলে নেয় সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এর মধ্যে নগরীর আম্বরখানায় গোয়াইপাড়া দারুস সালাম মাদ্রাসার সংগ্রহ করা ৮২৬টি কোরবানির পশুর চামড়া ফেলে রাখা হয়। এ ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ জানান, চামড়া ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দর কমিয়েছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com