বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

হাত পা ভেঙ্গেঁ বাড়িতে পাঠিয়ে দেব

হাত পা ভেঙ্গেঁ বাড়িতে পাঠিয়ে দেব

হাত পা ভেঙ্গেঁ বাড়িতে পাঠিয়ে দেব

তোর ব্যবসা ভাল কি মন্দ, লাভ কি লোকসান, এসব আমাকে জানিয়ে লাভ নেই। মাসের ৫ তারিখের মধ্যে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা পৌঁছে দিবি। কোন রকম ছলচাতুরি করলে হাত পা ভেঙ্গেঁ বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে বস্তায় ভরে ডাইরেক্ট মাঝ নদীতে….’। মঠবাড়িয়া ৪ নং ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছে সেখানকার ত্রাস মেহেদি হাসান নাঈম। সে স্থানীয় গিলাবাদ এলাকার বাসিন্দা মজিবুল হক আকনের ছেলে। বয়স ২০-কি ২২। না করে লেখাপড়া, না আছে আয়ের বৈধ কোন পথ। তবে এ কিশোরে নাম শুনলেই এলাকায় সবাই আঁৎকে ওঠেন। এর অন্যতম কারন মেহেদি হাসান নাঈমের রয়েছে নিজস্ব একটি কিশোর গ্যাং। তিন-চার বছর ধরে নাঈম এ গ্রুপটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজি, ইভটিজিং এবং র‌্যাগিং করাই হচ্ছে এ গ্রুপের কাজ। চাঁদা আদায়ে রয়েছে একটি টর্চার সেলও।

স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও রয়েছে এ গ্রুপের সখ্যতা। এলাকাবাসি বলছেন, নাঈম গ্যাং লিডার হলেও তার গডফাদার হচ্ছেন ৪ নং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক খান রাহাত। চিহিৃত সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দিলে চেয়ারম্যান রাহাত এসব কিশোরদের ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছেন। দাউদখালী গ্রামের আব্দুল মান্নান কাজীর ছেলে সাইফুদ্দিন ও একই এলাকার সুমনও এই গ্রপের সদস্য। এরা চেয়ারম্যান রাহাতের প্রশ্রয়ে হেন অপকর্ম নেই যা করে না। স্কুল শুরুর আগে ও ছুটির পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে আড্ডা দেয়া, ছাত্রীদের উত্যক্ত, বিভিন্ন অশ্লীল মন্তব্য, মাস্তানি করারই তাদের কাজ। এছাড়া বাজারের প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্টানে এরা চাঁদার অঙ্ক নির্ধারন করে দিয়েছে। কেউ কথা না শুনলে কিংবা সময়মতো চাঁদার টাকা পৌঁছে না দিলে তার ওপর চলে নির্মম অত্যাচার। নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলে। একজনকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে অন্যজনকে শিক্ষা দেয়া হয়। এটাই নাকি ওই গ্রুপের বিশেষ কৌশল। তাদের অত্যাচারে এলাকাবাসি অতিষ্ঠ। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। তবে গোপন সংবাদ ও নিজেদের সোর্সের মাধ্যমে জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের কানে পৌঁছে এ কিশোর গ্যাংদের কথা। প্রশাসনও বসে থাকেনি। অভিযান চালাতে থাকে কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে।

পিরোজপুর জেলার পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান জানান, গ্যাং কালচার একটি অপরাধের নতুনমাত্রা। কিশোর অপরাধীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় বড় অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে । বিশেষ করে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা রাতে বিভিন্ন স্থানে অপরাধ সংঘটিত করে। পড়াশোনা রেখে রাতে বাহিরে কেউ আড্ডা দিতে পারবে না। পিরোজপুর জেলায় কোনো কিশোর গ্যাং লিডার সৃষ্টি হতে দেয়া হবে না। পিরোজপুরে কিশোর গ্যাং রোধে গত ১০ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। ওই দিন সন্ধ্যার পর মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা থেকে মোট ৯২ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে মঠবাড়ীয়া উপজেলা থেকে গেপ্তার হয় ৮ জন। মঠবাড়িয়ায় কিশোর গ্যাং এর অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় এ গ্রুপ রুখতে পুলিশ ও স্থানীয়রা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু গডফাদারদের ও রাজনৈতিক শেল্টারে তা বন্ধ হচ্ছেনা।

কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সম্প্রতি মঠবাড়িয়ার থানা পুলিশের উদ্যেগে হোতখালী গ্রামে এক উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গুলিশাখালী ইউনিয়নের সি এন্ড বি বাজার সংলগ্ন হোতখালী গ্রামে পুলিশের উপ পরিদর্শক মানিক এ বৈঠক করেন। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম ঝনো সহ স্থানীয় সর্বসাধারণ উপস্থিত ছিলেন। এ বৈঠকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহব্বান জানিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সকলের সহোযোগিতা কামনা করা হয়।

গত ১১ সেপ্টেম্বর মঠবাড়িয়ায় সাফা ডিগ্রী কলেজে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এক মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) বিনয় কুমার বলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান। সভায় কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জাননো হয়।

কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হচ্ছে এসব কিশোর অপরাধীরাই এক সময় বড় অপরাধীর জন্ম দেয়। যা সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলে। পরিবার ও সরকার প্রত্যেকেরই উচিত নিজের অবস্থান থেকে জরুরি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে এ প্রবণতা ঠেকানো, তা না হলে অপরাধপ্রবণ তরুণ সমাজ দেশের জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনইস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, অপরাধীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি না হওয়ায় কিশোররা বিপথগামী হতে উৎসাহী হয়। কিশোরা ভোগবাদী প্রবণতা ও ক্ষমতার চর্চার প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়। ক্ষমতা ও টাকাই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। ঠিক ওই সময়ে সমাজের অন্যান্য অপরাধীরা তাদের স্বার্থে কিশোরদেরকে ছায়া দিয়ে বড় অপরাধী করে তোলে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ঘটনাগুলো কিশোদের অপরাধ প্রবণতায় উৎসাহিত করে তোলে। ফলস্বরূপ কিশোর অপরাধীদের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে বড় বড় অপরাধী। শুরুতেই এদের রোধ করা জরুরী।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com