রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২০, ০৫:০৩ অপরাহ্ন

#থানচি_নাফাখুম_আমিয়াখুম ❤

#থানচি_নাফাখুম_আমিয়াখুম ❤

#থানচি_নাফাখুম_আমিয়াখুম ❤

যখন থেকে নাফাখুম আমিয়াখুম সম্পর্কে জেনেছি তখন থেকেই তীব্র ইচ্ছা নিজ চোখে দেখা।এডভেঞ্চার প্রিয় হওয়ার কারনে দিন দিন এই আগ্রহ টা বাড়তেই থাকে,, এতোদিন তেমন সুযোগ পেয়ে কাজে লাগাতে না পারলেও, এবার দৃঢ় সংকল্প নিলাম যাবোই,, এই ভেবে আমরা ৫ জন ঠিক করলাম এই পূজোর ছুটিতে যাবো।। খোঁজ নিয়ে দেখলাম এখন বান্দরবানে অনেক বৃষ্টি হইতেছে, যাওয়া অনেক রিস্ক, আর আমিয়াখুম যাওয়া যাচ্ছে না বৃষ্টি আর পানি বেশি তাই,, কিন্তু ভেবে রাখেছি যাবো, তো যাবোই যতটুকু যাওয়া যায়।। এক বন্ধু খবর নিয়ে দেখলো ৮ তারিখ থেকে বৃষ্টি কম থাকবে আর ১০ তারিখ নাকি ফুলমুন😂😂(বান্দরবান পর্যন্ত আমার বন্ধুর দেখা ওয়েদার আপডেট ঠিক ছিল, তার পরের ৩ দিনে আর সূর্যের দেখা পাই না চাদ তো দুরের কথা😔😔, পুরো ট্যুরই ছিল বৃষ্টির মধ্যে 😊), তাই আমরা ৮ তারিখ রাতের সৌদিয়া বাসের ৫ টা টিকেট কাটলাম,,, ঢাকা থেকে বান্দরবান ভাড়া ৬২০ টাকা ,, সহজ-এপ থেকে কাটায় আমাদের ৬১০ টাকা করে লাগে,, বাস ছিল ১০.২০ তে কলাবাগান থেকে, এক্সাইটমেন্টের জন্য আমরা সন্ধ্যা ৬ টার দিকেই জাহাঙ্গীরনগর থেকে রওয়া দিলাম কালাবাগানের উদ্দেশ্যে,,,আর এইখান থেকেই আমাদের ৪ রাত ৩ দিনের বান্দরবান ট্যুর শুরু।।✌

#প্রথমদিনঃঃ সকাল ৫.৩০এর দিকে আমরা বান্দরবান পৌছে যাই, আমাদের গ্রুপ ছোট তাই আমাদের প্লান ছিল আমরা লোকাল বাসে করে বান্দরবান থেকে থানচি তে যাবো, বান্দরবান থেকে প্রথম বাস ৮ টার দিকে, ভাড়া জন প্রতি ২০০ টাকা করে।। কিন্তু বাস থেকে নামার পরেই একজন চাদের গাড়ির ড্রাইভার আমাদের প্লান শুনে তিনি নিজে থেকেই বললেন,,, আমার থানচির গাড়ি ৩০০০ টাকা দিয়েন তাহলে আমি যাব,, সাধারণত বান্দরবান থেকে থানচি ভাড়া ৫০০০ টাকা,,, অর্ধেক টাকায় চাদের গাড়িতে করে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আমরা আর হাত ছাড়া করলাম না। ড্রাইভারকে ইমোশনালভাবে কথা বলে আরো ৫০০ টাকা কমিয়ে ২৫০০ টাকায় ঠিক করলাম😁😁, থানচি যাওয়ার পথেই চিম্বুক আর নীলগিরি পরে, তাই কথা হল আমরা যাওয়ার পথে চিম্বুক আর নিলগিরি কিছুক্ষন ঘুরে তারপর থানচি যাবো,, সকাল অনেক তাই তখন আশেপাশে কোথাও নাস্তা করার মত দোকান না খোলা থাকায় চিন্তা করলাম থানচিতে গিয়েই নাস্তা করবো, এই ভেবে উঠে পরলাম চাদের গাড়িতে।
বেলা ১১ টার দিকে আমরা থানচি পৌছে যাই,, এর মাঝে আমরা যাত্রা পথে চিম্বুক পাহার, আর নিলগিরিতে ঘন্টা খানিক সময় কাটাই। বান্দরবান থেকে থানচি আমার দেখে সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা, এর সৌন্দর্য নিয়ে কিছু বলবো না,, আসলে বলে বা ছবি তুলে এইটার সৌন্দর্য বুঝানো যাবে না। থানচি থেকে ১০-১২কি.মি আগে বিজিবি চেকপোস্ট পরে, ওইখানে আমাদের সবার আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা দিয়ে নাম ঠিকানা লিখে এন্ট্রি করতে হয়(NID, Vcty ID, Birth certificate যেকোন একটা দিলেই হয়)।। বিজিবি এর একটা ক্যাফে আছে,,সকালের নাস্তাটা ওইখানে সেরে ফেলি( স্থানীয় বাগানের একদম ফ্রেস কমলার জ্যুস পাওয়া যায়, ট্রাই করে দেখতে পারেন)।।
কয়েকদিন আগে থেকেই ৪০০০টাকা দিয়ে(আমিয়াখুমের লোকাল গাইড সহ) ৩ দিনের জন্য গাইড ঠিক করি। আমিয়াখুম যাওয়ার ২ টা পথ আছে, একটা হল পদ্দঝিরি হয়ে ৭-৮ ঘন্টা ট্রেকিং করে থুইশাপাড়া দিয়ে, আর একটা হল রেমাক্রি হয়ে নাফাখুম দিয়ে জিন্নাপাড়া-থুইশা পাড়া হয়ে, এই পথটা তুলনামূলক অনেক সহজ তাই সবাই এই পথটাই বেশি ব্যবহার করে,,, কিন্তু আমরা অধিম এডভেঞ্চারের জন্য ঠিক করলাম পদ্দঝিরি হয়ে যাবো😑😑, তো গাইদ ওইভাবেই সব থিক করে রেখেছিল। বেলা ১ টার দিকে আমরা থানচি থানা, বিজিবির থেকে অনুমতি নিয়ে, লাইফ জ্যাকেট, পানি, স্যালাইন,গ্লুকোজ, শুকনো খাবার কিনে নৌকায় উঠে পরলাম সাংঙু নদী দিয়ে পদ্দমুখ যাওয়ার জন্য। কেননা পরে আর তেমন কোন খাবার কিনতে পাওয়া জাবে না।। ২৫-৩০ মিনিট অতিক্রম করার পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম পদ্দমুখে, এইখান থেকেই আমাদের ট্রেকিং শুরু।গাইড আমাদের থাকার জন্য থুইশাপাড়া একটা বাসা ঠিক করে রেখেছিল, খাওয়ার ব্যবস্থাও এইখানেই। আমরা ওইখানে রাত থেকে সকালে আমিয়াখুম জাবো এইটাই প্লান।। সাধারণত এইখান থেকে থুইশাপাড়া জেতে ৭-৮ ঘন্টা সময় লাগে কিন্তু আম্রা ৫.৩০ মিনিতেই পৌছে গেলাম,, এই ট্রেইল নিয়ে শুধু এইটুকুই বলি আপনি যদি এই ট্রেইল পার হইতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের যেকোন ট্রেইল অনায়েসে পাড়ি দিতে পারবেন,,, আর একবার গিয়ে নিজে নিজে চিন্তা করতে থাকবেন, চূড়ান্ত লেভেলের শিক্ষা হয়ে গেসে, আপনি আর এই ভুল কখনও করবেন না😂😂।এই ট্রেইলে ঝিরিপথ, পাহাড়ের ভয়ানক সবরাস্তা, বড় বড় পাথর, আবার কখনও তীব্র স্রোতের নদী পাড়ি দিতে হবে।কখনও কখনও মনে হয়েছে, আর সম্ভব না, এইখানেই থেকে যাবো😐,, চারিদিকে অন্ধকার ২ পাহাড়ের মাঝের ঝিরি পথ দিয়ে মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে আপনি হেটে যাচ্ছেন, একটু কল্পনা করে দেখুন, সে এক অন্য রকম অনুভূতি🤗। ৬ টার দিকে থুইশাপাড়া পৌছে রাতের খাবার খেয়ে সাথে সাথে ঘুম😴😴😴,,,, এমন ঘুম শেষ কবে পেয়েছিল মনে নাই।। রাতের খাবারের মেন্যুতে ছিল ভাত, আলু ভর্তা, পাহাড়ি মুরগি আর ডাল।।

#২য়_দিনঃঃ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই সবার মন অনেক খারাপ হয়ে গেল,কেননা সারারাত প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে, তখনও হইতেছিল,, আমাদের প্লান ছিল সকালে আমরা দেবতা পাহাড় পাড়ি দিয়ে আমিয়াখুম, ভেলাখুম দেখতে যাবো,,, কিন্তু বৃষ্টি হলে দেবতা পাহাড় পাড় হয়ে আমিয়াখুম যাওয়া প্রায় অসম্ভব।। ভাবলাম এতো কষ্ট করে এতো দূর যেহেতু এসেছি তাই অন্তত দেবতা পাহাড় পর্যন্ত গিয়ে দেখে আসি যাওয়া যায় কিনা, যদি অবস্থা ভাল হয় তাহলে যাবো না হয় ফিরে আসবো।। আর মাঝে আমাদের একবন্ধু বললো সে যাবে না, আমরা আর জোর করিনি,, সকালের খাবার খেয়ে ৯ টার দিকে লোকাল গাইড নিয়ে রওনা দেই আমিয়াখুমের উদ্দেশ্য,, ১.৩০ মিনিট হাটার পরে পোছে যাই দেবতা পাহারের চূড়ায়। তখনও বৃষ্টি হইতেছিল।। ওইখানে গিয়ে গাইডের প্রথম কথা ছিল….”এইটাই দেবতা পাহাড়, এইদিক দিয়ে নামতে হবে, অনেক খাড়া, আর বৃষ্টি হইতেছে, রাস্তা অনেক পিচ্ছিল, এইখান থেকে যদি পরেন তাহলে আপনাকে খুজেও পাওয়া যাবে না”” 😑😑৷ এইটা শুনে আমাদের এক বন্ধু সাথে সাথেই বলে দিল সে যাবে না।। যাবো নাকি ফিরে আসবো বুঝতেছিলাম না, তখন মনে হল বিজিবি ক্যাম্পে একটা গ্রুপের সাথে দেখা হয়েছিল, তারা এমনটা বলছিল– “নাফাখুম গিয়ে ঘুরে আসেন,, আমিয়াখুম ভুলেও যাইয়েন না এখন, আমরা ১৩ জন ছিলাম, অবস্থা দেখে আর শুধু ২জন গেছে, আর কেউ ই যায় নাই,, আর যেই ২জন গেছে তারা বলছে না গিয়ে অনেক ভালো হইছে, আর যদি জীবনের মায়াদায়া না থাকে তাইলে যান”। তখন মাথায় আসলো তাদের গ্রুপের ২ জন যখন যাইতে পারছে আমরা কেন পারব না,, তবে একটা ব্যাপার ছিল তখন বৃষ্টি ছিল না।।😔😔
দেবতা পাহারের উপর থেকে খুমের শব্দ শুনে অবশেষে ডিসিশন নিলাম যাবোই।। সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে চলা শুরু করলাম আমরা ৪ জন, প্রথম কিছুটা রাস্তা তুলনামূলক বেশি কঠিন না, আস্তে আস্তে অনেক সাবধানে পাড়ি দিয়ে আসলাম,, সবচেয়ে কঠিন হল মাঝেরবরাস্তাটুকু। প্রায় ৯০ডিগ্রি খাড়া, একটু পা পিছলে গেলে সোজা হাজার ফিট নিচে পাথরের অপরে😑😑😑,, এমনিতেই এত ঢাল তারপর রাস্তা প্রায় কাদা হয়ে গিয়েছিল😫।
শেষের রাস্তাটুকু মোটামুটি সহজ।।
দেবতা পাহার থেকে নামতে আমাদের ১ ঘন্টার মত লাগে,,,, ওইখান থেকে একটু সামনেই আমিয়াখুম যখন পৌছাবেন তখন আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হবে।। বলা হয়ে থাকে এইটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ঝর্না,,, আসলেই তাই,,, এইটা না দেখে যদি ফিরে যেতাম তাহলে জীবনে অনেক কিছুই অদেখা রয়ে যেত। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা, মাঝ দিয়ে প্রকান্ড পাথড়ের ঝিরি দিয়ে তীব্র বেগে পানি বেয়ে চলছে,, পাহার গুলা কুয়াশায় ঘেরা থাকায় পরিবেশটা আরো সুন্দর হয়ে উঠছিল,, সতি বলতে আমরা অনেক ভাগ্যবান ছিলাম এমন একটা সময়ে যেতে পেরে😍😍😍😍😍।।
পানির স্রোত অনেক হওয়ায় তখন ভেলা পাওয়া যায়নি,, তাই ভেলাখুম যেতে পারিনি।। খুমে অনেক্ষন থেকে আবার দেবতা পাহাড়ে উঠার পালা,,, নামার চেয়ে উঠা সহজ,,, অনেক সাবধানতার সাথে দেবিতা পাহাড় বেয়ে উঠে থুইশাপাড়া আসতে ৪টার মত বাজে।। ওই দিনটাও আমরা ওইখানেই কাটিয়ে দেই,, পরের দিনে গন্তব্য নাফাখুম, রেমাক্রি দেখে বান্দরবান।।

#৩য়দিনঃঃ সকাল ৫.৩০এর দিকে আমরা বেড়িয়েপরি নাফাখুমের উদ্দেশ্যে,, ২.৩০ ঘন্টা ট্রেকিং করে ৮টার দিকে আমরা চলে যাই নাফাখুম।। এই ট্রেকিংটা আমাদের জন্য সহজই ছিল।। নাফাখুমকে বাংলাদেশের নায়াগ্রা বলা হয়ে থাকে।।
সত্যি বলতে কি, আপনি যদি আগে আমিয়াখুম দেখে আসেন তাহলে নাফাখুম আর তেমন কিছু মনে হবে না, তবে নাফাখুমের সৌন্দর্য আপনাকের মুগ্ধ করতে বাধ্য।। এইখানে সবচেয়ে ভাল লেগেছে এতো স্রোতের ভিতরে মাছ দৃশ্যটা।। ঘন্টাখানিক নাফাখুমে কাটিয়ে আমরা আবারও ট্রেকিং শুরু করি রেমাক্রির দিকে। ৩০ মিনিট ট্রেকিং এর পর নৌকা পাওয়া যায় রেমাক্রি পর্যন্ত, কেউ চাইলে হেটেও আসতে পারেন, হেটে আসতে সময় লাগে ২-৩ ঘন্টা, আর নৌকায় আসলে ২০ মিনিটের মত, আমরা নৌকায় করে ১০টার দিকে রেমাক্রি চলে আসি, ভাড়া পরে ১০০০ টাকা। রেমাক্তি থেকে থানচি যাওয়ার নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল,,,, বলা ছিল ১২টার দিকে আসবে, তাই আমরা হাতে ২ ঘন্টা সময় পাই রেমাক্রি ফলস দেখার জন্য। পানির পরিমান অনেক বেশি হওয়ার জন্য তখন রেমাক্রিফলসের সৌন্দর্য অনেক গুন বেড়ে গেয়েছিল,বেশির ভাগ মানুষ এই রেমাক্রিফলস আর নাফাখুম দেখেই চলে যায়। প্রায় ২ ঘন্টা গা ভিজিয়ে বসে থাকার পরে ১২টার দিকে আমাদের নৌকা আসে।। তখন থেকে শুরু হয় বাড়িফেরার পালা, তবে তখনও বাকি ছিল সাঙু নদীর ভয়াবহরুপ দেখার। ভয়ংকর সুন্দর কথাটা এইটার সাথে খুব ভালোভাবে যায়।।। ২পাশে উঁচু পাহাড় মাঝে বড় বড় পাথড়ের ভিতর দিয়ে চলছে আমাদের নৌকা,,, দুর থেকে মেঘে ঢাকা পাহাড়গুলি দেখে আপনার কাছে স্বর্গ মনে হবে😍😍। চলতে চলতে দেখা মিললো বড়পাথড় ও রাজা পাথড়ের,,, প্রায় ১.৫ঘন্টা সাংঙু নদী দিয়ে চলার পরে আমরা চলে আসি থানচিতে।। 😇😇😇

থানচি থেকে সর্বশেষ লোকাল বাস ৩ টার সময়,,, ২০০ টাকা করে বাসের টিকিট করে বান্দরবানে আস্তে সময় লাগে ৪ ঘন্টা। এবার বান্দরবান থেকে বাসে করে পরেরদিন সকালে ঢাকা😊😊😊😊

এই ট্যুরে আমাদের জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে লাগছে, গ্রুপ বড় হলে খরচ কম হয়।।

আমরা যেখানেই যাইনা কেন পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনবো না, আর পাহাড়িদের সাথে কোন ধরনের খারাপ ব্যবহার করবো না।।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com