রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২০, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন

দ্যা কুইন’স নেকলেস…!

দ্যা কুইন’স নেকলেস…!

দ্যা কুইন’স নেকলেস...!

মুম্বাইয়ে মাত্র একদিন ঘুরে বেড়িয়েছি আমরা। এরচেয়ে বেশি সময় আমাদের হাতে ছিলোনা। সকালে পৌছেছিলাম মুম্বাই, সেদিনই রাত ১২ টায় আমাদের কলকাতার ফ্লাইট। যে কারনে কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে সারাদিন শুধু পুরো মুম্বাই চষে বেরিয়েছি যতটা পেরেছি। এই সারাদিনে নানা যায়গায় বেড়ানো হয়েছে, প্রতিটা যায়গাই কোন না কোন দিক থেকে অনন্য। আমার তো পুরো মুম্বাই শহরটাই দারুণ লেগেছে। মুম্বাইয়ের পুরনো দোকানপাট, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, বস্তি, নানা রকম মানুষের এক ভিন্ন রকম শহর মুম্বাই।

তবে এই নানা রকম যায়গার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে অনন্য যে যায়গাটা লেগেছে। সেটা হল মুম্বাইয়ের মধ্যে হয়েও একেবারে নিজস্ব নামে খ্যাঁত, দ্যা কুইন্স নেকলেস! অদ্ভুত একটা যায়গা এই দ্যা কুইনস’স নেকলেস। এই দ্যা কুইন’স নেকলেস নামটি অবশ্য সন্ধ্যায় থেকে রাত অবদি পেয়ে থাকে সে। এই একই যায়গার আরও দুটো নিজস্ব নাম রয়েছে। যার একটি এর প্রাচীন বা আসল নাম। আর অন্যটি পরিবেশের কারনে মানুষের মুখে মুখে তৈরি হয়ে গিয়ে খ্যাতিমান হয়ে গেছে! হ্যাঁ এই একটা যায়গারই তিনটি নামে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পরিচিত।

আসলেই তাই রাতে সন্ধ্যায় বা রাতে যার নাম “দ্যা কুইন’স নেকলেস” বিকেলে বা সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পরেই তার নাম হয়ে যায় “লাভারস মিট পয়েন্ট!” সেই যায়গা সকাল থেকে সারাদিন, প্রেমিক-প্রেমিকা বা নানা রকম মানুষের ভালোবাসা প্রকাশের আগ পর্যন্ত নিজের একান্ত নামে পরিচিত হয়ে থাকে সবার কাছে মেরিন ড্রাইভ নামে! জি হ্যাঁ এতক্ষণ মুম্বাইয়ের বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভের কথা বলছিলাম। যে যায়গাটা একাই সারাদিন ও রাত মিলিয়ে এই তিন নামে পরিচিত হয়ে গেছে।

সকাল থেকে দুপুরের শেষ পর্যন্ত “মেরিন ড্রাইভ”, দুপুরের শেষ থেকে সন্ধ্যার আগে, পুরো শহর নানা রঙের আলোয় আলোকিত হবার পূর্ব পর্যন্ত যার নাম থাকে “লাভারস মিট পয়েন্ট!” আর সন্ধ্যা নেমে চারদিকে আলোকিত হয়ে উঠলেই যে হয়ে ওঠে অপরূপ, অনন্য আর অনবদ্য। যে কারনে আদরে, ভালোবাসায় আর আবেগে তার নাম দেয়া হয়েছে “দ্যা কুইন’স নেকলেস!”

কি দারুণ একটা নাম, ওহ না, একটা তো নয় দুটো, তিনটা। আমি অভিভূত, ভীষণ আনন্দিত হয়েছি এই যায়গায় গিয়ে, দেখে আর উপভোগ করে। খুব অদ্ভুত লেগেছে যায়গাটাকে আমার। এমন একটা আধুনিক শহরের চারপাশে দিগন্ত ছোঁয়া সমুদ্রের নীল জলরাশি, আকাশ ছোঁয়া শত শত অট্টালিকা, কত তার রঙ, ঢং, আকার আর আকাশ ছুঁতে চাওয়ার অদম্য প্রয়াস। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। নানান রঙের, বর্ণের, প্রয়োজনের আর পেশার মানুষের এই শহর মুম্বাই।

আর সেই শহরের এক প্রাকৃতিক আভিজাত্য নীল সমুদ্রের ঘেরা চারপাশ আর তার অভিজাত মেরিন ড্রাইভ। প্রখর রোদেও এখানে গরম লাগেনা হু হু সামুদ্রিক বাতাসের তোড়ে, বিসৃত ওয়াক ওয়ের নানা যায়গায় আছে গাছের ছায়ার আচ্ছাদন, বসার জন্য অসংখ্য বেঞ্চি। আর ওয়াক ওয়ের পরে ঠিক সমুদ্রের তীর ঘেঁসে আছে বসার নিরাপদ যায়গা। যা দেখেই মনটা ভালো হয়ে যাবে এক মুহূর্তেই।

আমারও তাই হয়েছিল। যদিও আমি পাহাড় বেশী ভালোবাসি। অনেক অনেক বেশী। দুঃখ ভুলতেও আমি পাহাড়কে চাই! সুখ বাড়াতেও আমি পাহাড়কে চাই। তবে, সুখ-দুঃখের পাহাড়ের সাথে, মাঝে মাঝে সমুদ্রের রুপালী রঙের ঢেউ, নীল জলরাশি, উন্মুক্ত আকাশে কত রকম কোমল মেঘেদের উড়ে চলা, একটুখানি ঝিরঝিরে বৃষ্টি, সমুদ্রের মাতাল হাওয়া উপভোগ করতে মন্দ লাগেনা। বেশ উপভোগ্য লাগে।

তাই তো মুম্বাই পৌঁছে নানা যায়গায় ঘুরে দেখার মাঝে একটু পর পরই নিজের কাছেই নিজে অপেক্ষায় ছিলাম কখন চোখে পড়বে অনেক ছবি দেখা, নাম শোনা আর সিনেমায় দেখা সেই মেরিন ড্রাইভ? নীল সমুদ্রের চারপাশে লকেটের মত গড়ে ওঠা এক শহরের নানা রঙের আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা আর গায়ে মাখবো সমুদ্রের ঝিরঝিরে হাওয়া, দু চোখে ভরে দেখবো উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের আছড়ে পরা, অপলক তাকিয়ে থাকবো অনন্ত জলরাশির দিকে, সকল ক্লান্তি ধুয়েমুছে যাবে নিমিষেই।

সকালে এখানে মুম্বাইয়ের সমুদ্র তীরে গড়ে ওঠা অভিজাতেরা এখানে মর্নিং ওয়াক করে। দুপুরের খাঁ খাঁ রোঁদে মোটামুটি পুরো মেরিন ড্রাইভ বলতে গেলে ফাঁকাই থাকে। আমাদের মত অনাহূত হয়তো চোখে পরে দুই একজন করে। শেষ দুপুর থেকে এখানে শুরু হয় নিজের, বন্ধুর বা প্রেমিক-প্রেমিকার অথবা ভালোলাগার মানুষের জন্য যায়গা রেখে অনন্ত অপেক্ষার প্রহর গোনা। মানুষে মানুষে একটা সময় এখানে আর বসে বাড়িয়ে চুপচাপ উপভোগ করা যায়না সমুদ্র, তার ঢেউ, উচ্ছ্বাস, মাতাল বাতাস, গাছের ছায়া, নীল আকাশ না আকাশ ছোঁয়া শত অট্টালিকা।

একটা সময় বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামে এই সমুদ্রের তীরবর্তী শহরের আনাচে কানাচে, শত সহস্র অট্টালিকায় জলে ওঠে নিয়ন আলো, নানা রঙের আলোর রোশনাই যখন ছড়িয়ে পরে অট্টালিকার বাইরের সমুদ্রের স্বচ্ছ আর নীল জলরাশিতে তার যে রিফ্লেকশন পরে পুরো মেরিন ড্রাইভের বাঁক ধরে, যা দেখতে অবিকল কারো গলার হার বা দামী জ্বলজ্বলে নেকলেস এর মত।

কোন রাজকন্যা বা রানীর গলার হারই সাধারণত এতোটা ঝলমলে, জ্বলজ্বলে আর উজ্জ্বল আলো ও আভা ছড়াতে পারে। তাই তো সন্ধ্যার আলোকবর্তিকায়, সকালের চুপচাপ মেরিন ড্রাইভ, বিকেলের ভালোবাসায় মুখরিত লাভারস মিট পয়েন্ট, সন্ধ্যায় হয়ে ওঠে এক অন্য ভুবন, হেসে ওঠে এক স্বর্গীয় রূপে, সে এক অপরূপ অলংকার যেন। যা কেবল মাত্র কোন রাজকন্য অথবা রানীকেই মানায়। যে কারনেই বোধয় রাতের মুম্বাই শহরের এই অভিজাত ও দুর্লভ সমুদ্র পাড়ের নাম হয়েছে “দ্যা কুইন’স নেকলেস!”

তিন সময়ের তিন রূপের এই সমুদ্র তীর ধরে যেতে যেতে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কতশত ভালোলাগা-ভালোবাসা, প্রেম-বিরহ, আবেগ-অনুভূতি, আশা-নিরাশা, চাওয়া-পাওয়া এখানে ভেসে চলে, উড়ে যায়, আকাশে মিলায়, সমুদ্রের জলরাশিতে হারিয়ে যায়, হাহাকার তোলে। কতশত, সহস্র জনের কত স্বপ্নের, গল্পের, কল্পনার সূচনা হয় এখানে তার কোন হিসেব নেই, থাকেনা, রাখা সম্ভব হয়না। শুধু সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকে এই মেরিন ড্রাইভ, লাভারস মিট পয়েন্ট আর রাতের দ্যা কুইন’স নেকলেস।

এটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন একটি সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা, তাই আমরা কেউ যেন এঁকে কোন ভাবেই নোংরা না করি। শুধু এই যায়গা নয়, আশা করছি আমরা কেউই কোথাও স্বেচ্ছায় ময়লা ফেলে নোংরা করবোনা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com