বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২২ পূর্বাহ্ন

কোলকাতা -সিমলা-মানালি-দিল্লি ট্যুর (পর্ব ১)

কোলকাতা -সিমলা-মানালি-দিল্লি ট্যুর (পর্ব ১)

কোলকাতা -সিমলা-মানালি-দিল্লি ট্যুর (পর্ব ১)

আমার হঠাৎ সাদা পাহাড় দেখার খুব ইচ্ছা জাগলো,দেশে যেহুতু সাদা পাহাড় নেই আমাকে দেশের বাইরে যেতে হবে তাই সব চেয়ে কাছের দেশ ইন্ডিয়া যাওয়ার প্ল্যান করি,গ্রুপ থেকে কিছু ইনফরমেশন ও কালেক্ট করলাম দার্জিলিং যাবো ঠিক করলাম ওখান থেকে আমার ইচ্ছা টা পুরন করবো, এর আগে আমি বিদেশি ট্রাভেল রিভিউ গুলা কম পড়তাম ইন্ডিয়া যাবো বলে খুব ঘাটাঘাটি শুরু করি এগুলা নিয়া, পরে সিক্কিম ও দেখি খুব সুন্দর খরচ ও কম, সিদ্ধান্ত নিলাম সিক্কিম আর দার্জিলিং যাবো,কুমিল্লা আইভ্যাক এ আমি আর আমার কাজিন ভিসার আবেদন করি কারো টাই হয়নি দেখে খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল,এরপর আমি ২য় বার আবেদন করলেও আমার কাজিন তার বাবা অসুস্থ থাকার কারণে আর আবেদন করলোনা, একলা হয়ে পড়লাম তাও ভিসা করি এবার ভিসা হয়ে যায় তাই টিওবি তে পোস্ট দেই ট্যুরমেট এর জন্য কিন্তু মনের মত পাচ্ছিলাম না,এদিকে আমার পরিচিত ভাই রা মানালি যাওয়ার কথা ছিল কোন কারণে যাওয়া হয়নি পরে আবার মানালি যাবে বলে ঠিক করলো আমিও তাদের সাথে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেলি
আমি আর রাকিব ভাই কুমিল্লা থেকে যাবো আর অন্য জন ফরিদপুর থেকে ১৫ তারিখ রাতে কুমিল্লা বিশ্ব রোড থেকে ৭৫০ টাকা দিয়ে হানিফ এ উঠে পড়লাম বেনাপোল এর উদ্দেশ্যে

দিন ১.

খুব ভোর এ পৌছাই, বেনাপোল বর্ডার তখনো খুলেনি,হানিফ কাউন্টার এর লোক আমাদের থেকে পাসপোর্ট আর ট্রাভেল ট্রক্স এর টাকা আর ঘুশ নিয়ে চলে গেলো প্রথম বার ছিল আমাদের ২ জন এর তাই না বুঝেই দিয়ে দিলাম আর প্রথম বার বেশির ভাগ মানুষ মুরগি হয়ে যায়,যাক নাস্তা করে ইমিগ্রেশন এর দিকে আগাই,বাংলাদেশ কাস্টমস এর পুলিশ সবার সামনে ঘুস চাচ্ছিল ব্যাগ স্ক্যান এ দিয়ে সোজা হেটে গেলাম,ইমিগ্রেশন এ গিয়া আবার আরেক ঝামেলা রাকিব ভাইয়ার পাসপোর্ট এর মেয়াদ ২ মাস ছিল তাকে সাইড এ নিয়া ঘুস নিল কিছু😑
বর্ডার পার হয়ে টাকা এক্সচেঞ্জ করলাম,আমরা ৮২.২০ টাকা পাইছিলাম ওদিন রেট কম ছিল অনেক দোকান ঘুরে এটাই সব চেয়ে বেশি পাইছিলাম মানি এক্সচেঞ্জ করে ৩০ রুপি করে অটো তে চলে গেলাম বনগাঁ স্টেশন,এরপর ২০ রুপি দিয়ে টিকেট কেটে চলে শিয়ালদহ, বর্ডার এ চাপ থাকায় আর ট্রেন লেট করায় কোলকাতা পৌঁছাতে বিকাল হয়ে যায় এরপর বাস এ ৮টাকা দিয়ে নিউ মার্কেট নামি হোটেল না খুজে অন্যন্য ভাইয়ার অপেক্ষা করি সে আসার পরে কলিন লেন এ ৮০০টাকায় একটা হোটেল ঠিক করি ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নেই এরপর বের হয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে আসে পাশে ঘুরি আর কিছু শপিং করি রাতে মুসলিম হোটেল এ খেয়ে এসে জলদি শুয়ে পড়ি,পরদিন সকালে ট্রেন এর টিকেট কাটার জন্য উঠা লাগবে

দিন ২-

সকালে উঠে টেক্সি দিয়ে চলে যাই ফ্যায়ারলি প্যালেস ওখান থেকে ফরেনারদের টিকেট কাটতে হয় ফাকা কলকাতা দেখতে দেখতে চলে যাই ফ্যায়ারলি প্যালেস, হাওড়া টু কালকার টিকেট কাটি আমরা ১০৫০ রুপি দিয়ে স্লিপার এ জেনারেল এ ৭০০ রুপি নেয় ফরেন কোটায় বেশি নেয়
টিকেট কাটা শেষ হলে উবার এ করে ১০০ টাকায় চলে যাই হোটেল এর ওদিকে, কোলকাতায় উবার এ সুবিধা, আর টেক্সি ড্রাইভার গুলা বাটপার হয়,মেট্রো তে করে আমি আর রাকিব ভাই রবিন্দ্র সাদান চলে যাই সেন্ট ফল ক্যাথেড্রাল এ যাই খারাপ না ভালোই জায়গা টা, ছবি তুলে বাইরে চলে আসি,স্টিট ফুড ট্রাই করি বাইরে এসে,যদিও ভিক্টোরিয়া তে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু কোন একটা কারনে যাওয়া হয়নি
ঘুরাঘুরি শেষ করে, মারকুস স্টিট এ এসে খাওয়া দাওয়া সেরে হোটেল এর লকার থেকে ব্যাগ নিয়ে চলে গেলাম হাওড়া স্টেশন,ওখান থেকেই বলতে গেলে আমাদের ট্যুর শুরু,৭:৪০ এ ট্রেন ছাড়ার কথা ঠিক সময়ে ছাড়লো ট্রেন,আমি অনেক এক্সচাইটেড আবার নার্ভাস ও,এতক্ষণ কিভাবে ট্রেন এ থাকবো,ট্রেন এ উঠার পর দেখি আমাদের পাশের সিট এ বাংলাদেশি কাপল তারাও সিমলা মানালি যাবে শুনে খুব খুশি হলাম তাদের সাথে আড্ডা দেওয়া শুরু করলাম,কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ি আমরা

দিন ৩.

৭-৮টার দিকে মনে হয় উঠে চোখ মেলে তাকাতেই সামনের সিট এর কাকিমা মায়ের দায়িত্ব পালন করায় ব্যাস্ত হয়ে গেলো, উনি নিজেও ঘুমান নি আমাকে আর ঘুমাতে দিলোনা 😂, এখানে এসেও শান্তি নাই,যাক উঠলাম উঠে ফ্রেশ হয়ে ফোন নিয়ে বসে পড়লাম,একটা স্টেশন এ থামালে সেখান থেকে খাবার আর ৫ রুপি দিয়ে পানি কিনে উঠে পড়ি ট্রেন এ,ফোন এ আমরা লুডু খেলা শুরু করলাম,কানপুর স্টেশন আসলো দুপুর এর দিকে নেমে একটু হেটে ডিম বিরিয়ানি নেই ৬০ রুপি(জঘন্য ছিল), কোনো রকম খেয়ে শুয়ে পড়ি,ট্রেন এর কোন খাবার ভালো না একবারে বাজে খাবার,ট্রেন এর ভিতর হোক স্টেশন এ হোক , যাক ট্রেন এই আড্ডা দিতে থাকি রাতে এসে দিল্লি নামলাম ৩০মিনিট ব্রেক,তাই অনেক্ক্ষণ ঘুরাঘুরির সূযোগ পেলাম,কেক চিপ্স পানি এগুলা নিয়ে ট্রেন এ উঠে পড়লাম, কারন এ ৩বেলা খেয়ে আমার আর ট্রেন খাবার খাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা

দিন ৪.

৫:৪০ এ আমাদের ট্রেন কালকা পৌছালো, কালকা তেই খুব ঠান্ডা লাগতেছিল জ্যাকেট ১টার জায়গায় ২টা পরে আমি আর বাংলাদেশি আপু গেলাম সিট দখল এ বাকিরা গেছে টিকেট কাটতে,কোনো টাতেই সমস্যা হয়নি ৬:২০ এ আমাদের টয় ট্রেন ছাড়লো সিমলার দিকে,ট্র‍য় ট্রেন এ চড়ার ইচ্ছা টাও সপ্ন টাও পুরন হয়ে গেলো,যেতে যেতে ৪-৫ ঘন্টা লাগবে তাই ভাবলাম একটু ঘুমিয়ে নেই, আমার আবার ঘুম বেশি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে উঠলাম আর প্রকৃতি উপভোগ করতে থাকি,টয় ট্রেন এর জার্নি টা খুব মজার ছিল টানেল গুলা আসলেই সবাই এক সাথে চিল্লাইয়া উঠা,আর আশে পাশের পাহাড় গুলাও খুব সুন্দর ছিল,টয় ট্রেন থেকেই প্রথম বরফ দেখতে পাই,যদিও অনেক কম ছিল কিন্তু দেখতে ভালোই লাগছিল,১২টায় গিয়ে সিমলা পৌছাই,Booking.com থেকে ৬৫২ রুপিতে হোটেল বুক দেই, হোটেল থেকে লোক এসে আমাদের নিয়ে যায়,তারপর ফ্রেশ হয়ে নেস্ট নেই ৩৯ ঘন্টা জার্নির পর সবার চেহারা দেখার মত হইছিল🤣,কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ি,খেয়ে এসে কিছুক্ষণ পর মল রোড এর দিকে চলে যাই,কারন সেদিন কোথাও যাওয়ার সময় আর অবস্থা ও ছিলনা,মল রোড টা খুবই সুন্দর ছিল,মনে হচ্ছিল ইউরোপ চলে আসছি, সন্ধা পর্যন্ত ওখানে থাকি তারপর ঠান্ডা বাড়াতে রুম এর দিকে আসার পথে কিছু স্ট্রিট ফুড খাই,তারপর রুম এ এসে প্লান করি কালকে কোথায় যাবো,যেহুতু আমি স্টাডি করে আসিনি ওনারা ২জন প্ল্যান করে ঠিক করলো নারকান্দা যাবে,বাইরে গিয়ে খোজ নিয়ে দেখি নারকান্দা বন্ধ,অনলাইন এ ও চেক করে দেখলো বন্ধ,কুফরি যাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও কুফরি যাবো বলেই ঠিক করি,টেক্সি ঠিক করতে গিয়া দেখি ১৫০০ করে চাচ্ছে ৩জন এর,পরে টেক্সি আর ঠিক করিনাই,রাতের খাবার ১০০ রুপি দিয়ে ভেজ থালি খেয়ে এসে শুয়ে পড়ি

দিন ৫.

সকালে ঘুম থেকে রাকিব ভাই আর অনন্য ভাই উঠে আমাকে উঠায়,সব সময় এর মত আমি দেরি করেই উঠলাম ঘুম থেকে,তারা ২জন আমাকে রেখে বাইরে চলে গেলো গাড়ি ঠিক করার জন্য,ওনারা ভেবেছিল আমি রাগ করেছি আমাকে রেখে গেছে এজন্য,কিন্তু আমি খুশিই হইছিলাম একটু বেশি ঘুমাতে পারছিলাম,৮০০ রুপি দিয়ে গাড়ি ঠিক করে রুম এ ফিরে আসলো,তারা নাস্তা খেয়ে আমার জন্য নিয়ে আসলো কিন্তু সেটা আমার কপালে ছিলনা, বানর তা ছিনিয়ে নেয়🤣, বানর থেকে সাবধান,
রেডি হয়ে হোটেল চেক আউট করে গাড়ি নিয়ে কুফরি চলে গেলাম, যাওয়ার পথে ড্রেস আর সু ভাড়া নিতে গিয়া তো অবাক হয়ে গেলাম,৭০০ করে চাচ্ছে আর ঘোড়া নিয়া গেলে ১০০০,পরে আমরা ৫০০ তে ড্রেস আর সু নিয়ে নিলাম,৫০ টাকা দিয়া ম্যাগি গেলাম টেস্ট ভালো ছিল তাই সব জায়গা থেকে ২০রুপি বেশি হওয়া তেই কিছু বলিনি,যাওয়ার পথে তারা ঘোড়া নেওয়ার জন্য কত কাহিনি করলো, কিন্তু পাত্তা না দিয়ে চলে গেলাম উপরে, উপরে উঠে ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটলাম, পরে চিন্তা করলাম ঘোড়া না নিয়ে জিতে গেলাম এই টুক রাস্তার জন্য ৫০০ রুপি একদম বেশিই হয়ে গেছিলো, কুফরি তে আমার জীবন এর প্রথম এর এত বরফ দেখা,অনেক বেশি মজা করেছি বরফ নিয়া,এই অনুভূতি কখনোই লিখে বুঝানো সম্ভব না,পুরাদিন কুফরি তে থাকলাম নামার আগে ৩০রুপি দিয়ে ম্যাগি ২০রুপির পাকোড়া,আর ১০ রুপির চা খেয়ে নিছে নেমে আসলাম,আসার পথে রাস্তা এত পিচ্ছিল ছিল আমি ৩বার পড়ে গেছিলাম যদিও ব্যথা পাইনি,হেটে উঠলে একটু সাবধানে উঠবেন আর জুতা চেক করে নিয়েন আমার জুতা টা খারাপ ছিল,ড্রাইভার কে আমরা আগেই বলে রাখি আমাদের যেন মানালি যাওয়ার বাস স্ট্যান্ড নামিয়ে দেয়, সে পুরাতন বাস স্ট্যান্ড নামিয়ে দেয়,ওখান থেকে ১০রুপি দিয়ে নতুন বাস স্ট্যান্ড এ চলে গেলাম বাস এ করেই,তারপর সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার জন্য বাস এর টিকেট কাটি এসি তে ৬৫০ টাকা দিয়ে,ভোলভো ছিলনা তাই এই জঘন্য বাস এ করেই যেতে হইছিল,পা ও ঠিক মত রাখা যাচ্ছিলো না এরকম বাজে অবস্থা ছিল,নাম ঠিক মনে বাস টার,বাস কাউন্টার এর পাশেই দোকান আছে অনেক,ওখান থেকে জাতীয় খাবার ম্যাগি আর চিপ্স খেয়ে উঠে পড়ি বাস এ, পাহাড়ি রাস্তা তাই আর শক্ত খাবার খেলাম না,যারা যাবেন তারাও চেস্টা করবেন শক্ত খাবার না খাওয়ার জন্য না, পাহাড়ি রাস্তায় শক্ত খাবার খেয়ে জার্নি করলে বমি করার সম্ভাবনা থাকে

বি:দ্র: দেশে বা দেশের বাইরে যেখানেই যাই না কেনো, প্রকৃতি কে তার মত থাকতে দিন, ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *