মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন

মসজিদের শহর বাগেরহাট ভ্রমন (Bagerhat Visit) –

মসজিদের শহর বাগেরহাট ভ্রমন (Bagerhat Visit) –

মসজিদের শহর বাগেরহাট ভ্রমন (Bagerhat Visit) -

বাগেরহাট মসজিদের শহর। দর্শনীয় হিসেবে ষাট গম্বুজসহ অনেক উল্লেখ্যোগ্য মসজিদ, যাদুঘর, খান জাহান আলীসহ অন্যান্য মাজার, খান জাহান আলী দিঘি, ঘোড়াদিঘি, রামপাল, মংলা বন্দর ও সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পরেছে এই জেলায়। এগুলো সব একদিনে দেখা সম্ভব না।

আমি একদিনের প্লান নিয়ে বের হয়েছিলাম যতদুর দেখা যায় এই আশায়। খুলনা হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমে গেলাম ষাট গম্বুজ মসজিদ। এটির নির্মাণকাল বা নির্মাতা সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয়, খান জাহান আলী ১৫ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদটি বহু বছর ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। গর্বের বিষয় যে, বাগেরহাট শহরকে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৮৩ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

হযরত খান জাহান আলি (১৩৬৯-১৪৫৯) সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ষাট গম্বুজ মসজিদের কাছে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক এর লেখা ইতিহাস অনুযায়ী, খান জাহান আলী, উলূঘ খান-ই-জাহান ও খান-উল-আজম নামেও পরিচিত। তিনি যোদ্ধা ও ধর্ম প্রচারক। তিনি ইলিয়াস রাজবংশের শাসনকালে বাংলার এই অংশটি জয়লাভ করেছিলেন এবং এখানেই শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ১৫ শতকের দিকে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই শহরটিকে ১৬ শতকের দিকে ‘খলিফাতাবাদ’ নামে ডাকা হত। এটি বর্তমান বাগেরহাট শহরের একটি অংশ ছিল। কালের বিবর্তনে ঐ শহরের ঠিকে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ অন্যতম।

নামে ষাট গম্বুজ হলেও এখানে গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি। এরমধ্যে ৭০ টির উপরিভাগ গোলাকার এবং পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা আর বাকি ৭ টি গম্বুজ অনেকটা চৌচালা ঘরের চালের মতো। আর যদি মিনারের ৪ টি গম্বুজ যোগ করা হয় তাহলে মোট গম্বুজ হয় ৮১। ফলে নামকরনের জন্য অনেক ঐতিহাসিকের মতো আমারও মনে হয়, মসজিদের ভেতর ৬০ টি প্রস্তরনির্মিত স্তম্ভ আছে যার ওপর এই গম্বুজগুলো অবস্থিত, তাই নাম হয়েছে ষাট গম্বুজ হয়েছে।

এখানে ঢুকলে এর শীতল ও সুন্দর ছিম-ছাম পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দিবে। এই কমপ্লেক্সের ভেতর মসজিদ ছাড়াও একটি যাদুঘর আছে, ‘বাগেরহাট যাদুঘর’। এই যাদুঘরে খান জাহান আলীর ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র, পায়ের ছাপ, আর ১৫ শতকের পোড়ামাটির ইট, তৈজসপত্র, মুদ্রা, কড়ি ইত্যাদি আছে। কালাপাহাড় নামক কুমিরের চামড়া দিয়ে একটা কুমিরও বানানো আছে।

মসজিদের বাইরের নির্মানশৈলী খুব চমৎকার। মসজিদের ভেতর জুতা খুলে ঢুকা যায়। ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে সুন্দর সাড়িবদ্ধভাবে ৬০ টি স্তম্ভ। ভেতরটাও বেশ সুন্দর।

ষাট গম্বুজ মসজিদের পাশেই ঘোড়াদিঘি। বেশ বড় এক দিঘি। ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখার পাশাপাশি এখানেও পর্যটকগন বেড়াতে আসেন। দিঘির পাড়ে বসার ঘাট রয়েছে। আর জলে ফুটে আছে অপূর্ব সুন্দর নয়ন জুড়ানো লাল শাপলা।

ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে একটু দুরে খান জাহান আলীর মাজার। প্রধান গেইট ধরে মাজারে যাবার রাস্তার দুইধারে আতর, মোমবাতির ইত্যাদির দোকান। মাজারের পাশেই ঝাল-মুড়ি, চানাচুর, ফুসকা, চটপটি সহ খেলনার দোকানও আছে। সব মিলিয়ে বিশাল এক ব্যাবসায়িক কর্মযজ্ঞ।

মাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ল ৫/৬ জন খাদেম, মাজারের কেয়ার টেকার। এক কোনায় একটা খাঁচা। খাদেমরা মাজারে জিয়ারত করতে আসা মানুষদের গাইড করছে, জুতা খুলাচ্ছে, কেউ মুরগী দিলে নিয়ে খাঁচায় ভরছে, মানত/টাকা দিলে নিয়ে প্রমান সাইজের তালা দেয়া লোহা নির্মিত দান বাক্সে ঢুকাচ্ছে। মূল “কবর” যথারীতি শালু কাপড় (গিলাব) দিয়ে ঢাকা। এখানে দেখলাম সেটা হলুদ রঙের, অনেক যায়গায় লাল বা সবুজ রঙের থাকে। এই কবরটির চারিদিকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। যারা জিয়ারত করতে চায়, ভেতরে যেয়ে দোয়া দরুদ পড়ে। আমার অবশ্য বিন্দুমাত্র মাজার ভক্তি নাই। আমি শুধুমাত্র দেখার জন্য গিয়েছিলাম।

খাদেমরা দেখলাম কোন মানুষ ভেতরে ঢুকা মাত্র বিভিন্ন রকম কথা বলে ও কাজ করে সবার মধ্যে ভয়-ভক্তি সৃষ্টি করায় ব্যতিব্যস্ত। মুরগির বিষয়ে কারো না জানা থাকলে, এটা কুমিরের খাবার হিসেবে অনেক দান করে। কিন্তু কয়টা আসলেই কুমিরের পেটে যায় আর কয়টা রিসাইকেল হয়ে দোকানে ফেরত যায় আল্লাহই জানেন।

কুমিরের গল্পটা আরো মজার মিথ। অনেকে, বিশেষ করে কেয়ার টেকারগনদের মতে, খান জাহান আলী নাকি এখানে এসেছিলেন দুইটা কুমিরের (?) পিঠে চড়ে। কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নাম। অই কুমিরের বংশধরদের জন্যই এই মুরগী।

যাই হোক মাজার থেকে বের হলেই বিশাল দিঘি, নাম খান জাহান আলী দিঘি। এটি ‘ঠাকুর দিঘি’ নামেও পরিচিত। মাজার থেকে বের হয়ে একটু হাঁটলেই আরেকটি মাজার পরবে, যেখানে গেলে এই কুমির দুটো দেখা যাবে। ওখানেও মানত, দান ইত্যাদি তারা আশা করে ও নেয়া হয়, অনেকে দেয়ও। আমি যেয়ে কুমির খোঁজ করতেই দেখালো। দুই কুমির দেখলাম দিঘির পাড়ে দিব্বি শুয়ে আছে।

ইতিহাস মতে, খান জাহান আলীর নির্মান করা মিঠা পানির এই দিঘির নিরাপত্তার জন্যই তিনি দুইটা কুমিড় ছেড়ে দেন। সেই থেকেই বংশ পরমপরায় খান জাহান আলী দীঘিতে এই মিঠা পানির কুমির বসবাস করে আসছে। বর্তমানে পুরাতন আমলের একটি পুরুষ কুমিরসহ ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা ৪ টি মিঠা পানির কুমিরের ৩ টি এই দীঘিতে রয়েছে।

এরপর দেখলাম, সিঙ্গাইর মসজিদ, ষাট গম্বুজ মসজিদের উল্টা দিকে। দেখলাম, ‘চুনখোলা’ মসজিদ। মেইন রাস্তা থেকে অনেকটা পথ হেঁটে কাঁচা / ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে এখানে যেতে হয়। চুনখোলা মসজিদ যাবার পথে পরবে এক গম্বুজ বিশিষ্ঠ ‘বিবি বেগনী’ মসজিদ। এই দুই মসজিদের স্থাপত্যকলা আর নির্মাণশৈলী দেখে ধারনা করা হয় এগুলো খান জাহান আলীর সময়কালেই নির্মিত হয়েছে। এগুলো কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো ঠিকে আছে।

এছাড়া খান জাহান আলীর মাজার এর কাছেই রয়েছে বর্গাকৃতির এক গম্বুজ বিশিষ্ট ‘জিন্দা পীর’ মসজিদ। এই কমপ্লেক্সের ভেতরে নামফলকবিহীন অনেক কবর আছে। এই মসজিদের নির্মান ও দেয়ালে পোড়াটির চিত্র ভিন্ন হওয়ায় এই মসজিদটি খান জাহান এর পরবর্তীকালে হোসেন শাহ বা তার পুত্র নুসরত শাহর আমলে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারনা করা হয়। স্থানীয়রা মনে করেন একজন বুজুর্গ ব্যাক্তি কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা অবস্থায় একদিন অদৃশ্য হয়ে যান। একারণে মনে করা হয়ে থাকে যে ঐ ব্যাক্তি এখনও জীবিত আছেন আর তাই তাঁকে জিন্দা পীর বলা হয় এবং মসজিদটিকে বলা হয় জিন্দা পীরের মসজিদ।

এছাড়া আছে ‘নয় গম্বুজ’ মসজিদ। এখানেও দেখলাম খাদেমদের দৌরাত্ব, তবে মাজার থেকে অনেক কম। ইনারা আমাকে মসজিদের ভেতরে দেখালো। ভেতরে এক পিলারে দেখলাম একটা গর্ত। তাদের মতে, খান জাহান আলীর আঙুলের ছাপ এটা। বিশাল সাইজের। এতো বড় কেন, কারন জানতে চাইলে জানালো, দোয়াপ্রার্থী মানুষ নাকি হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বড় করে ফেলেছে। আমাকে বলল, মনে মনে মনের বাসনা বলে সেখানে হাত ঘুরিয়ে চুমু খেতে। এরা সরাসরি টাকাও চাইল হাদিয়া হিসেবে। তাকে পাত্তা না দিয়ে চলে আসলাম।

এই সবগুলো মসজিদই কালের বিবর্তনে ঠিকে থাকা ১৫ শতকের স্থাপনা। এগুলো পোড়ামাটির ফুল ও লতা-পাতার নকশা সমৃদ্ধ ইট দিয়ে তৈরি। এখানে সময় কাটালে আপনার মনে হবে ১৫ শতাব্দীর সেই খলিফাতাবাদ-এ ফিরে গেছেন। ঐতিহাসিক ঐতিহ্যমন্ডিত মসজিদের শহর বাগেরহাট ঘুরে খুবই ভাল লাগল। পরিতৃপ্ত মনে বাড়ির পথ ধরলাম।

কিছু টিপসঃ
√ মাজারে না ঢুকাই উত্তম, ঢুকলে একটা ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে যাবেন।
√ মনে রাখবেন, ভয় পেলেই আরো ভয় দেখাবে, অতি ভক্তি দেখালে ভক্তির মাসূল দিয়ে আসতে হবে।
√ ভুলেও আতর আর মোমবাতির ফাঁদে পড়বেন না। মেইন রাস্তা থেকে মেইন গেইট দিয়ে না ঢুকে আরেকটা সাইড রোড আছে, সেটা দিয়ে ঢুকে আগে জিন্দাপীর মসজিদ দেখে পরে মাজারে ঢুকবেন। তাহলে মেইন গেইটের পর রাস্তার দুই পাশে বসা দোকানীদের এড়াতে পারবেন।

©️ Shafiqur Rahman

বিঃদ্রঃ আমরা যেখানেই ভ্রমন করি না কেন, আশে-পাশের পরিবেশ কোনভাবেই নোংরা করব না।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *