মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১২:৪৯ অপরাহ্ন

বাদামী মেঘালয়ার বাদামী কাব্য

বাদামী মেঘালয়ার বাদামী কাব্য

বাদামী মেঘালয়ার বাদামী কাব্য

সিলেট তামাবিল বর্ডার থেকে স্নোংপেডাং এর দূরত্ব মাত্র সাড়ে আট কিলোমিটার।সেখানেই মিলবে মন জুড়ানো অতি স্বচ্ছ নদী উমগট।
নদীর ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া নৌকাগুলো দেখে অবাক মানবেন। মনে হবে এগুলো কি আসলে শূন্যে ভাসছে? নিচে নদীর তলার পেটে নৌকার ছায়া দেখা যাবে স্পষ্ট যেমন আমরা খোলা জমিনে কারো ছায়া দেখি।
উমগট নদীই বাংলাদেশে জাফলং সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পরিচিতি পেয়েছে পিয়াইন নদী হিসেবে। এই পিয়াইন নদীতেই নয়নাভিরাম বিছানাকান্দি পর্যটন স্পট। যেখানে গিয়ে পারিপার্শ্বিক রূপ সৌন্দর্যে বাকহারা হয়ে যান অনেকে।
বাংলাদেশে প্রবেশ পথেই উমগট নদী দুই ভাগে বিভক্ত, যার প্রধান শাখা পিয়াইন। অপর শাখাটি ডাউকি বা জাফলং নামে প্রবাহিত হয়। পিয়াইন আর জাফলং নদীর উৎপত্তি উমগট যার উৎপত্তি আসামের জৈন্তিয়া পাহাড়ে।
বাংলাদেশে ১৪৫ কিলোমিটারের পিয়াইন নদী সিলেট জেলার ছাতকের উত্তরে শনগ্রাম সীমান্তের কাছে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। পিয়াইন নদী জাফলং, বিছনাকান্দি ও ভোলাগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত। দেশের বৃহত্তম পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ পিয়াইন নদীকে নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে।

তামাবিল এবং জাফলং এর পানি দেখে অবাক হয়ে ভাবতাম যে এত স্বচ্ছ পানি যেখান থেকে প্রবাহিত হয় সেখানের পানি জানি কত স্বচ্ছ।এ যেনো প্রকৃতির এক আয়না,পাথর দিয়ে সাজানো আয়না।নদীর পাশে তাবুতে রাত কাটানো এবং তাবুর সামনে পাথরের ভাজে ক্যাম্প-ফায়ার! এ যেনো স্বপ্ন। আমার জীবনের সেরা সময়টি কাটিয়েছি এই স্বপ্নময় জায়গাতে।স্নোংপেডাং এ আসার স্বপ্ন বহুকালের। যখন প্রথম জাফলং এসেছি তখন থেকেই স্বপ্নের যাত্রা এবং আজ স্বপ্ন সার্থক। মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয়,একমাত্র ভ্রমণ ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব অর্থহীন।

এবার গন্তব্য এশিয়ার ক্লিনেস্ট ভিলেজ মাওলিনং।

গল্পটা শুরু হয় দ্বিতীয় দিন থেকে।স্নোংপেডাং থেকে বার হতে দেরি হয়ে যায়।এরকম প্রকৃতির মায়া কি সহজে ছেড়ে আসা যায়! ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে উঠি,যাত্রা এবার এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ গ্রাম মাওলিনং।দুপুর তিনটের দিকে ভিলেজে নেমে লাঞ্চ করে নেই।তারপর হাঁটা শুরু করি। আমার দেখায় সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর গ্রাম এটি।একেবারে ছবির মত।মনে হবে আপনি কোন ছবির মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন।এখানকার মানুষ গুলোর রুচিও ঠিক প্রকৃতির মতই সুন্দর। সবকিছু দেখে আমার মনে হয়েছে গ্রামের মানুষগুলো প্রকৃতির রক্ষা কবচের দ্বায়িত্ব পালন করছে।সেখানের প্রতিটি জিনিসের সাথে আপনি কারুকার্য এবং রুচিবোধ খুঁজে পাবেন।পরিবেশ প্রকৃতি পাহাড় এবং সেখানের মানুষ সবকিছুর মাঝে অদ্ভুত একটা মিল।

মাওলিনং ভিলেজ এশিয়ার সবচেয়ে ক্লিনেস্ট ভিলেজ হয় ২০০৩ সালে এবং ইন্ডিয়ার ক্লিনেস্ট ভিলেজ হয় ২০০৫ সালে।ভারতীয়রা এটাকে বলে থাকে ইশ্বরের নিজের বাগান।

কলকাতা থেকে প্রচুরসংখ্যক মানুষ আসে মেঘালয়া ভ্রমণে। সেখানেই অনেকের সাথেই কথা হলো। দেশ সমাজ রাজনীতি, প্রকৃতির সাথে গল্পটা বেশ জমে উঠেছিলো। যতক্ষণ গ্রামে ছিলাম ততক্ষণে আমার মনে হয়েছে আমি ইলুশনে আছি।এখানে আমরা বেশি একটা ছবি তুলিনি।সময় কম এবং নিজেরা ফিল নেয়ার চেষ্টা করেছি বেশি। বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে,সময় খুব কম।

মাওলিনং থেকে চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথে একটু সময় নিলাম রুয়াই গ্রামে। এখানে রয়েছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি—লিভিং রুট ব্রিজ। পাহাড়ি ঝিরির দুই পাশের গাছ মিলে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে জীবন্ত এই সেতু। মাথার ওপরে জীবন্ত গাছ, পায়ের নিচে টলটলে পানি!
এরপরের গল্পটুকু স্রেফ অবিশ্বাসের—এরা পাহাড় কাটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে! টানা আধঘণ্টা এবড়োখেবড়ো পথে চলার পর হুট করে রাস্তাটা হয়ে গেছে মসৃণ, মাখনের মতো! সে মাখনে প্রলেপ দিতে দূর থেকে ছুটে আসছে মেঘের দল, মুহূর্তের মধ্যেই তারা ঢেকে দিল পুরো রাস্তা। রাস্তার দুপাশ জুড়ে মেঘের ঘরবসতি। এ সময় কেউ নিচ থেকে তাকালে নিশ্চিত দেখত যে মেঘের ওপর দিয়ে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়িগুলো!
পথিমধ্যেই রাত হয়ে যায়।চেরাপুঞ্জিতে গিয়ে আমরা একটা হোম স্টেতে উঠি।সেখানে তার আটটার পর তেমন কিছুই খোলা থাকে না।আমাদের ড্রাইভার ড্রেইন খুবই ভালো মানুষ ছিলো, অসম্ভব রকমের হেল্পফুল। সে আমাদের একটা খাবার হোটেলে নিয়ে যায় রাত নয়টার দিকে।রিকোয়েস্ট করে রাতের খাবারটা খেয়ে নেই।তখন তাপমাত্রা ছয় ডিগ্রিতে নেমে এসেছে।শীতে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো। রাত বারোটার দিকে তাপমাত্রা তিনে নেমে আসে।দুইটা জ্যাকেট,কানটুপি,মাস্ক,মোজা সব কিছু গায়ে প্যাকেট করে উপরে দুইটা কম্বল দিয়ে ঘুমাইছি।আমার বন্ধু তিনটা কম্বল গায়ে দিয়েছে😐

পরদিন সকালে বের হয়েছি চেরাপুঞ্জির স্বাদ নিতে।পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় চেরাপুঞ্জিতে। এখানেই দেখা মিলে বিশ্ববিখ্যাত সেভেন সিস্টার ওয়াটার ফলসের। মেঘালয়ের সাতটা রাজ্যের পানি এখানে এসে পড়ে বলেই এর নাম সেভেন সিস্টার্স। এসব পানি সিলেটের ভোলাগঞ্জ হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। সেভেন সিস্টার্সের একেবারে মাথায় এসে দাঁড়ালে পরিষ্কার দেখা যায় বাংলাদেশের গোটা সুনামগঞ্জ এলাকা। এখান থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম নোহকালিকাই ওয়াটার ফলসে। তারপর আরোয়া কেইভে।আরোয়া কেইভটা অদ্ভুত সুন্দর ছিলো। কেইভের মুখ পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটা ছিলো অসাধারণ সুন্দর। লাইট এবং আবহাওয়ার জন্য সবকিছুর ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।তারপর আরো দুই একটা স্পট দেখে ওয়াকাবা ফলস গিয়ে থামি।শীতকালে ফলসে পানি থাকে না।আমার যাওয়ার উদ্দেশ্যটা ফলস দেখা ছিলো না,ছিলো শীত কালীন বাদামী স্কটিজ মেঘালয়া দেখার।তবে ফলসে পানি না থাকলেও সমতল থেকে কয়েক মাইল উপরে, মেঘের উপর মাথা তুলে দাঁড়ানো পাহাড় গুলোর মায়াবী সুন্দর আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
এবার উদ্দেশ্য লাইটলুম, আহা বাদামী লাইটলুম।চোখ জুড়ানো সুন্দরের দেখা পেয়েছি লাইটলুমে।প্রথমে একটু রোদ পেয়েছি।তারপর হালকা মেঘ,তারপর এত পরিমান মেঘ ছিলো যে ছবি তোলাই অসম্ভব ছিলো। মাত্র এক ঘন্টায় আমরা তিনটা ভিউ পেয়েছি।প্রকৃতির কত রূপ কত মায়া।🥰

মনের জটিলতা দূর করুন,বিশ্বাস করেন স্বর্গ আপনার ইচ্ছে শক্তির মাঝে আবদ্ধ।

প্রকৃতির কোন দেশ নেই।প্রকৃতির মায়াময় সুন্দর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে রাখতে যতটুকু সম্ভব সচেতন থাকুন এবং ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।ডাস্টবিন ব্যবহার করুন।যদি আপনার কারণে পরিবেশ দূষিত হয়,তাহলে মনে করবেন আপনি প্রকৃতি প্রেমী নয় এবং আপনার মন পশু সমতূল্য।

এই ভ্রমণ ছিলো ৫ রাত,৪ দিন।ঢাকা টু ঢাকা।আমাদের চারজনের গ্রুপ ছিলো। জনপ্রতি খরচ হয়েছে ৮,৫০০ টাকা করে।রিভার্স প্ল্যান ছিলো আমাদের।তামাবিল বর্ডার পার হয়ে ডাউকি বাজারে গিয়ে টাকা টু রুপি করে চারদিনের জন্য গাড়ি রিজার্ভ নেই নয় হাজার রুপি দিয়ে।তারপর ক্রাংছড়ি ঝর্ণা টু স্নোংপেডাং (রাত) পরদিন মাওলিনং, লিভিং রুট, ব্যালেন্সিং রক টু চেরাপুঞ্জি (রাত) সেখানে ছয়টি স্পট কাভার দিয়ে রাতে সিলং যাই।পরদিন জ্যামে পড়ি অনেক সিলং এ,তাই লাইটলুম কাভার দিয়ে বর্ডারে চলে আসি।ক্রস করে তামাবিল থেকে বাসে সিলেট। পাঁচ ভাইতে খেয়ে রাতের বাসে ঢাকা।

(ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন এবং ধরিয়ে দিবেন,ধন্যবাদ)

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com