বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ০৭:২৬ পূর্বাহ্ন

ইউরোপ ভ্রমনের আরেকটি গল্প লিখতে বসলাম

ইউরোপ ভ্রমনের আরেকটি গল্প লিখতে বসলাম

ইউরোপ ভ্রমনের আরেকটি গল্প লিখতে বসলাম

এবারের গন্তব্য ছিলো ফ্রান্স, স্বপ্নের শহর প্যারিস।

প্যারিস যাওয়ার সিদ্ধান্ত হুট করেই নেওয়া। আমি বর্তমানে জার্মানীতে আছি। কোন এক ক্লাসে এতো ঘুম পাচ্ছিলো বলার মতো না, ফেইসবুকে গুতাগুতি করেও টাইম পাস হচ্ছিলো না। পরে স্কাই স্ক্যানার এপে ঢুকে প্লেইন টিকিট চেক করতেছিলাম। আর ৩৫ ইউরোতে বার্লিন টু প্যারিসের প্লেইন টিকেট পেয়ে গেলাম যা সাধারনত ৭০-৮০ ইউরোর নিচে হয়না কখনও। মাঝে মধ্যে হুদাই অনলাইনে এই শহর থেকে ঐ শহরের নাম, ডিপারচার আর এরাইভালের তারিখ অদল বদল করে সার্চ করতে থাকি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই, কমদামে টিকেট পেলেই ঝুপ বোঝে খুপ দেওয়া।

যাক এবার চলুন ব্যাক টু দ্যা কাহিনী।

শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, দুপুর একটা বাজে। “কই তুই? ফ্লাইট হইছে?- ফোনের ওপাশ থেকে বলছিলো প্যারিসবাসী স্কুল বন্ধু দুলাল। চেক ইন এ ছিলাম তখন। বার্লিন টেগেল এয়ারপোর্ট থেকে চার্লস ডি গুলে এয়ারপোর্টে পৌছাইলাম বিকেলের দিকে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই দেখতে পেলাম কেউ একজন হাত নাড়ছে, আরেক স্কুল বন্ধু লায়েক। এগিয়ে এসে বুকে টান দিয়ে জড়ায় ধরার চাপে মনে হলো সে আমার জন্যে খুব আকুল হয়েই অপেক্ষা করছিলো। প্রায় চার বছর পর দেখা কিন্তু সেই আগের মতোই আমরা।

প্রথমে লায়েকের বাসায় গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকে “RER B” ট্রেন ধরে স্টেশন থেকে হেটে “La Courneuve” তে তার বাসা। সেখান থেকে তার পংখীরাজে চড়ে গেলাম দুলালের বাসায়। তখন রাত হয়ে এসেছে। রাতের ফ্রান্স দেখতে দেখতে ৩০ মিনিট পরে “Place de Clichy” তে পৌছে বাসায় ঢুকে দেখলাম সেখানে কেউ নেই। দুলাল সাহেব কাজে ছিলেন। বন্ধুর সাথে দেখা হয় সন্ধার অনেক পর। ততক্ষনে তার রান্না করা ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে পেট পুরে খেয়ে বসে আছি আমি। প্রথম রাত আড্ডা দিয়েই কেটে গেলো, তারপর একটা আরামের ঘুম।

দ্বিতীয় দিন, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি লায়েক হাজির। তার বাইকে চড়ে চলে গেলাম কলেজ বন্ধু বদরুলের এর বাসায়। তিনি আমার জন্যে বিরিয়ানি রান্না করিলেন এবং তাহা আহার করিয়া দুই বন্ধু গৃহ হইতে প্রস্থান করিলাম প্যারিস অবলোকন করিতে। আমরা প্রথমেই দেখতে যাই প্যারিসের নিউইয়র্ক/২য় নিউইয়র্ক খ্যাত “La Defense”. সেখান পাশেই একটা শপিং মল আর গতবছরের উদ্ভোদন হওয়া নতুন রাগবি স্টেডিয়ামের বাইরে কিছুক্ষন হেটেই আকুপাকু শুরু হয়ে যায় মূল আকর্ষণ “Eiffel Tower” দেখার জন্যে। লায়েকের সাথে পরেরদিন সকালে যাওয়ার কথা থাকলেও আর যেনো অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। বদরুল কে নিয়ে চলেই গেলাম সেই কাঙ্খিত “Eiffel Tower”. মেট্রোতে চড়ে চুপচাপ বসে থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ভেতরে একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো। সেটা বলে বুঝানোর মতো না। মেট্রো থেকে নেমে একটু হেটেই অবশেষে দেখা পেলাম আইফেল টাওয়ারের। “Whoaaahhh!! This is Beauty… বলতে বলতে পায়ের হাটার স্পীডটা একদম কমে যেতে অনুভব করলাম। সত্যিই অসাধারন। আমরা যখন খুব সুন্দর কিছুর গুনগান অনেক দিন থেকে শুনি এবং এতোই বেশী শুনি যে মনের ভেতরে একটা অয়বব আঁকা হয়ে যায়। একটা কাল্পনিক চিত্র মনের ভেতরেই দীর্ঘদিনের যত্নে আঁকা হয়ে যায়। আর যখন তা বাস্তব হয়ে আপনার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় আপনি চুপ হয়ে যান, শব্দহীন হয়ে যায় আপনার অনুভূতি। এরকমই কিছু একটা ঘটছিলো আমার সাথে। ট্রাস্ট মি অর নট, এ যেনো এক অন্যরকম সুন্দর।

তৃতীয় দিনের শুরু হয় আবার লায়েকের বাইকে চড়ে। “Uber Eats” এ খাবার ডেলিভারি চাকরীর সুবাদে তার বাইকের পেছনে বসিয়ে আমাকে ইচ্ছা মতো প্যারিস ঘুরিয়ে দেখায়। প্যারিসের হয়তো কম বেশ সব রস্তা দিয়েই যাওয়া আসা হয়ে গেছিলো এই কয়দিনে। লায়েকের বাসায় দুপুরের বিশাল আয়োজনের খাবারপর্ব সেরে দুলালসহ তিন বন্ধু মিলে ঘুরতে বের হই। বৃষ্টির কৃপায় আমরা বেশিদূর যেতে পারি নি। প্যারিসের সবচেয়ে বেশী বাঙালী অধুষ্যিত দুই এলাকা “Gare du Nord” এবং “Quatre Chemins” তে ঘুরে দেখলাম। কি? নাম কঠিন মনে হচ্ছে? কোনো প্যারা নাই। বাঙালীদের কাছে এগুলো “গারদেনর্দ” আর “কেতচিমা/কেচ্চিমা’ বলেই পরিচিত। পরিবেশের কথা কি বলবো, যেদিকে তাকাই পুরাই বাঙালী ফ্লেভার। রাস্তার পাশে এক ভাই পান বিক্রি করতেছিল। পাশেই কেউ একজন বাংলায় তার ফোনে কথা বলতে বলতে গেলো। কয়েকজন ভাই রাস্তায় কম দামে সিগারেট বিক্রি করছিলেন। ইউরোপের রাস্তায় দাড়িয়ে কেউ ঝাল মুড়ি বিক্রি করছে, বললে কি খুব বেশি বাড়িয়ে বলছি বলে মনে হবে? আশেপাশে অনেকগুলো বাঙালী রেস্টুরেন্ট ছিলো। চা,সিঙারা,ফুচকা থেকে শুরু করে বিড়িয়ানী আর ডাল-ভাঁজি সবই আছে। পাঁচ ইউরো দিয়ে খাসির মাংসের ঝোল আর ডাল দিয়ে খেয়ে মনে হলো মনের আক্ষেপ কিছুটা হলেও মিটাতে পারলাম।

চতুর্থদিনের ঘুরাঘুরির মধ্যে উল্যেখযোগ্য হচ্ছে, “The Arc de Triomphe” যা প্যারিস গেইট নামে সরবাধিক পরিচিত। একটা গোল চত্তরের মতো যায়গায় এটা দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আশেপাশের প্রায় দশটি রাস্তা একসাথে এসে মিলেছে আর এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় জিনিস হচ্ছে সুন্দর দেয়ালের উপরের সুন্দর কারুকার্য আর খুদাই করে লিখা যা পড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ভাবলাম যে “লিখা বুঝে কি করবো? নিজের চোয়াল অনেক ইম্পরট্যান্ট। প্যারিস গেইট থেকে রওয়ানা দিলাম “Cathedrale Notre-Dame de Paris” দেখতে যার লোকেশন হচ্ছে Jean Paul II. কিছুক্ষন সেখানে থেকে আবার ইচ্ছা হলো Eiffel Tower দেখবো। আবার গেলাম Eiffel Tower দেখতে। যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে গগনে ততক্ষনে চাঁদ উঠে গেছে। আবার সেই রাতের দৃশ্য। দিনের আলোতে দেখতে পারিনি বলে খানিকটা হতাশ হলেও পরে যত কাছে যেতে লাগলাম ততো ভালো লাগতে শুরু করলো। Eiffel Tower দেখে ঐদিনের মতো ঘুরা শেষ করে ফিরে এলাম।

পঞ্চম ও শেষদিনে আরো দুই একটা যায়গায় যাওয়ার প্ল্যান থাকলেও সব ক্যানসেল করে দিয়ে মনস্থির করলাম দিনের বেলায় Eiffel Tower না দেখে গেলে মোটেই চলবে না। পাঁচ দিন ঘুরে শেষমেশ সাথে করে আফসোসের বস্তা নিয়ে যাওয়ার মতো পাবলিক আমি নই। “চল তোকে একটা পাহাড়ী এলাকায় নিয়ে যাই, জায়গাটা ভালো। লায়েকের প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়ে বললাম “উহু!! আইফেল টাওয়ারেই যাবো… যেই ভাবা সেই কাজ। গাড়ির পেছনে চড়ে বসলাম আর দিনের বেলা আইফেল টাওয়ারের সৌন্দর্য অবলোকনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করিলাম। অনেক দূর থেকে দেখা যায় এবং বিল্ডিঙয়ের ফাঁক বলেন কিংবা গাছের আড়াল থেকে মালটা এমনভাবে দেখা যায় যেনো মনে হয় আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অস্থির, এক কথায় অবর্ণনীয় সুন্দরের প্রতীক ফ্রান্সের সবচেয়ে সুন্দর স্থাপনাটি (আমার মতে)। ইচ্ছেমতো ডানে, বামে, নিচ দিয়ে, সাইড দিয়ে ঘুরলাম। সবাই ঠিকই বলে, প্শুযারিসের সৌন্দর্য রাতে একরকম আর দিনে অন্যরকম। শুধু Eiffel Tower না বরং এই পাঁচদিনে প্যারিসের সৌন্দর্য যে পরিমান দেখার সুযোগ হইছে পায়ে হেটে এতো কিছু দেখা কোনভাবেই সম্ভব হতো না। বন্ধুর বাইক থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিলো এটাই।

ঐদিনই ছিলো শেষদিন এবং আরোও কয়েকটা যায়গা ঘুরার বাকি ছিলো। এবার মতো রওয়ানা দিলাম “Louvre Museum” এর উদ্দেশ্যে। আমি গরিব মানুষ ভেতরে ১৫ ইউরো খরচ করে ঢুকি নাই। আর হ্যা, Eiffel Tower এর উপরেও উঠা যায় আপনি যদি প্যারিসের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা থেকে পুরো শহর দেখতে চান। এরকমই একটা এমাউন্ট দিতে হয় খুব সম্ভবত সেটা ২০ ইউরো। সেই রাইডও নেই নাই।

লুভরে ইচ্ছামতো ছবি তোলে চলে আসি “Montemarte” দেখতে যাবো বলে। ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাওয়া রাস্তায় পর্যটকদের ভীড় ঠেলে উপরে উঠলেই দেখতে পাবেন একটা উঁচু পাহাড়ের উপরে ক্যাসেল সদৃশ ক্যাথেড্রাল/চার্চ। ভেতরে না ঢুকলেও বাইরে থেকে দেখতে খুবই সুন্দর।

আমার এখন কোন ভালো ক্যামেরা নেই। এত সুন্দর জায়গাগুলো দেখে খুবই আফসোস হইচ্ছিলো। কি আর করা, লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোন বের করে কাজ চালাইতে হইলো। হাতের ফোনটাই যে ছিলো শেষ ভরসা।

হ্যা, মোটামুটি এই ছিলো আমার ফ্রান্স ভ্রমনের কিচ্ছা কাহিনী। অনেক অনেক বেশী উপভোগ করতে পেরেছি এই পাঁচদিন। দিনগুলি এতো বেশী স্মৃতিময় করে দেওয়া কারিগর আমার বন্ধুদের কাছে আবারও ঋনী হয়ে গেলাম। কিছু বন্ধুত্ব কখনও পুরনো হয়না, হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়না যতদিন না আমরা সুযোগ করে দিচ্ছি। তোরা ভালো থাকিস, এটাই একমাত্র চাওয়া। আর প্যারিস সম্পরকে কি বলবো। রাস্তা থেকে শুরু করে খাবার, সৌন্দর্য, শিল্প, ইতিহাস ঐতিহ্য কিংবা স্থাপত্য কারুকার্য কোন দিকেই যেনো কমতি নেই। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে ইনশাল্লাহ।

সবশেষে কিছু কথা বলতে চাই। আমাদের আশেপাশের পরিবেশটা সৃষ্টিকর্তা সত্যিকার অর্থেই অনেক সুন্দর করে গড়ে দিয়েছেন। আমাদের উচিত এর সঠিক যত্ন করা, সঠিক পরিচর্যা করা। ভ্রমনে গেলে খেয়াল রাখবেন যাতে আমাদের কৃতকর্মের জন্যে যাতে এই সুন্দর পরিবেশটার ক্ষতি না হয়। হ্যাপি ট্র্যাভেলিং…

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 BangaliTimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com