সোমবার, ১৩ Jul ২০২০, ১০:৩৬ অপরাহ্ন

বিদেশি ক্রেতাদের আচরণে বাংলাদেশি কারখানা মালিকের চোখে পানি

বিদেশি ক্রেতাদের আচরণে বাংলাদেশি কারখানা মালিকের চোখে পানি

বিদেশি ক্রেতাদের আচরণে বাংলাদেশি কারখানা মালিকের চোখে পানি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস শুরুর পর হঠাৎ করে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল, স্থগিত ও পাওনা টাকা আটকে দেওয়ায় বাংলাদেশি এক পোশাক কারখানা মালিকের কান্না আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকায় মোস্তাফিজ উদ্দিন নামে এই পোশাক ব্যবসায়ীর কারখানা ডেনিম এক্সপার্টে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বেতন-বোনাস দেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন এই কারখানা মালিক পাওনা টাকা আদায়ের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি।

তিনি শুক্রবার গণমাধ্যমে বলেন, বরাবরের মতো এবারও ঈদের আগে শ্রমিকদের হাতে বেতন-বোনাস আর ঈদ উপহার তুলে দেওয়ার তাড়না থেকে টানা ১০ দিনের বেশি বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে আসছিলেন। শেষ দিন সকাল ১০টায় ব্যাংকে বসেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন।

বিকাল ৩টার দিকে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা কোনো দেশ থেকেই টাকা আসেনি। তাই আজকে আর কোনো লেনদেনের সুযোগ নেই।

“এ কথা শোনার পর আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আগের রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি। বুধবার সকালে শেষ কর্মদিবসে শ্রমিকদের কী করে খালি হাতে বিদায় করব তা ভাবতেই আমার কান্না চলে আসে। কিছুক্ষণের জন্য নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।”

তার কান্নার ছবি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে অ্যাপারেলইনসাইডার ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইট।

২০০৯ সালে চট্টগ্রামে কারখানা বানিয়ে মাত্র কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করেন মোস্তাফিজ উদ্দিন। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি, ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ভাতা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপন করে ইউরোপ আমেরিকার ক্রেতাদের নজরে আসেন।

বাংলাদেশি পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা ও পশ্চিমা ক্রেতাদের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে গত পাঁচ বছর ধরে ট্রেড শো এবং ব্যবসায়ী সম্মেলন আয়োজন করে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘ডেনিম মোস্তাফিজ’ নামে।

কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি থেকেই সংকটের শুরু হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার পশ্চিমা বিশ্বে পোশাকের চাহিদা যায় কমে।

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ক্রেতা কোম্পানি আকস্মিকভাবে একের পর এক কার্যাদেশ বাতিল করতে থাকে। অনেকে পণ্য হাতে পেয়েও সেগুলোর দাম আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাবে, করোনাভাইরাসের কারণে দেশের ১ হাজার ১৫০ কারখানার ৩১৮ কোটি ডলারের পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। তাতে প্রায় ২২ লাখ পোশাকশ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই সংকটের শিকার মোস্তাফিজ বলেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতাদের কাছে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে।

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘হাতে গোনা দুই-চারটি কারখানা হয়ত এমন ধাক্কা সমলাতে পারবে। কিন্তু আমার মতো ছোট কারখানাগুলো কী করে টিকে থাকবে।’

যদিও শেষ মুহূর্তে পরিচিত বন্ধু-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে এবারের ঈদের বোনাস শ্রমিকদের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি।

বিদেশি ক্রেতাদের অসহযোগিতার কথা তুলে ধরে মোস্তাফিজ বলেন, ‘মহামারি শুরু হওয়ার পর ক্রেতারা কোনো আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে অর্ডারগুলো বাতিল করে দিলো, কিছু শিপমেন্ট স্থগিত করে দিল। তারা অর্ডার করল, আমরা পণ্য তৈরি করলাম। এখন তারা টাকা না দিয়ে অর্ডার স্থগিত করল, এটা তো কোনো ব্যবসার পদ্ধতি হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার আমেরিকার ক্রেতারা ফেব্রুয়ারি মাস থেকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আমাকে তো শ্রমিকের বেতনসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। তাদের উত্তর হচ্ছে, তারা সময় হলে টাকা দেবে। কিন্তু তাদের কখন সময় হবে? সে পর্যন্ত আমার শ্রমিকরা কি না খেয়ে থাকবে? তারা যদি অস্থিরতা শুরু করে?’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *