চা বাগান!

কথাটা মস্তিস্কে এলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজের চাদরে ঘেরা একটা দৃশ্য।কি সুন্দর দেখতে!মুহুর্তেই সকল ক্লান্তি মুছে সতেজ করে দেয় আমাদের মন।
কিন্তু এই সবুজের চাদরের পেছনের মূল মানুষ গুলো সম্পর্কে,দিনরাত অক্লান্ত পরশ্রম করা বাগানীদের সম্পর্কে আমরা ঠিক কতটুক জানি?কিংবা আদৌ কি জানি?
এই প্রশ্নটা মনে বিধছিলো বহু বহু দিন ধরে।উত্তরটা খুজতেই ছুটে গিয়েছিলাম চায়ের রাজ্যে।চেয়েছিলাম বাগানীদের সম্পর্কে জানতে,তাদের জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে।
না,

হোটেল,রেস্ট হাউজ,বাংলোতে থেকে এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে চাওয়াটা একেবারেই বোকামী।একেবারে গোড়ায় যাওয়া ছাড়া এই প্রশ্নের উত্তর কোনোভাবেই খুজে পাওয়া সম্ভব নয়।
একারনেই শহর থেকে অনেক অনেকটা দূরে বাগানীদের একটা পাড়া সিলেক্ট করেছিলাম,
মোবাইলের নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ রকম বাইরে বিচ্ছিন্ন একটা পাড়া।

ম্যাপে দেখলে জায়গাটাকে ভারতের বর্ডারের ভেতরে বলে ভুল হবে।মূলত নো ম্যান্স ল্যান্ড ঘেষে টিলার ওপরে এই পাড়ার অবস্থান।
আমি চাইনা তাদের ইকোসিস্টেমে বিন্দুমাত্র ব্যঘাত ঘটাতে,তাই আমার লেখায় পাড়ার অবস্থান উহ্য রেখে দিচ্ছি,থাকুক না তারা তাদের মত প্রকৃতির সাথে মিশে।
পাড়ায় পৌছানোটা বিরাট এক ঝক্কির ব্যপার হয়ে দাড়ালো।মূল শহর থেকে বাসে এক উপজেলা,উপজেলা থেকে সি এনজি তে একটা ছোট বাজারে,সেখান থেকে আবার লেবুর গাড়িতে চেপে আরেকটা গ্রামে,আবার সেই গ্রাম থেকে পায়ে হেটে প্রায় ৭ কিলো হেটে আমাদের কাঙখিত সেই পাড়া!
পৌছুতেই দুপুর তিনটে বেজে গেলো!

সেই সাথে মোবাইল ও বিগত কয়েকদিনের জন্য নেটওয়ার্কের আওতায় চলে গেলো।
ও’পর্যন্ত পৌছুতে যতটা না বেগ পেতে হলো,তার থেকে বেশী বেগ পেতে হয়েছিলো পাড়াতে থাকার অনুমতি জোগাড় করতে।
এই প্রত্যন্ত পাড়ায় এই জেলার কয়েকজন লোকাল সাইক্লিস্ট ছাড়া বাইরের কেউ কখনো আসে নি,রাতে থাকা ত দূরের ব্যপার।
পাড়ায় ঢুকতেই আমাদের দেখে বাজারে মোটামুটি একটা জটলা বেধে গেলো।

উৎসাহিত কিন্তু ভীত চোখে তাকিয়ে ছিলো সকলে।মোটামুটি মিনিট দশেকের মধ্যেই মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি এসে হাজির।এলাকার মাস্টারের ছেলে,সম্মানীয় ব্যক্তি।
আমাদের সাথে নিয়ে তার বাসার অভিমুখে যাত্রা করলো।মাস্টারের সাথে দেখা করতে হবে।এই পাড়ার সকল বাগানীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে উনি।
বহিরাগত কেউ এলে প্রথম “মাস্টার” এর সাথেই দেখা করতে হবে,এটাই এখানের প্রথা।
চা বাগানের ম্যানেজারকে এরা বাবু বলে সম্বোধন করে।বাবুর অনুমতি ছাড়া এখানে গাছের পাতাটাও নড়বে না।
নিরাপত্তার দায়িত্বে মাস্টার।

পাড়া পরিচালনার জন্যে আবার সভাপতি,
পঞ্চায়েতের মাথাও উনি ই!
তিনজনের থেকে আলাদা আলাদাভাবে থাকার অনুমতি নিতে পারলে তবেই থাকতে পারব এখানে।
অনেক কথাবার্তার পরে থাকার অনুমতি অবশেষে মিললো।কিন্তু তাবু তে নয়,আমাদের অনুমতি হলো গীর্জায় থাকবো যে’কদিন থাকি।
আমাদের সমস্যা ছিল না কোনোই,কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের যে বিষয়টা তেমন মনপুত হয়নি তা তাদের চেহারায় ই বলছিলো।ম্যানেজার অনুমতি দিয়েছে কিছু বলতেও পারছে না।
ব্যপারটা খেয়াল করেই আমরাই সভাপতিকে একটু আড়ালে ডেকে বললাম আমরা আরেকটু খুজে দেখতে চাই যদি পাড়ার আশপাশে কোথাও আড়াল একটু পাই সেখানেই টেন্ট পিচ করবো,যাতে এলাকার কারো কোনো সমস্যা না হয়।উনি রাজি হলেন।

আমরাও খুজতে খুজতে পাড়ার শেষের টিলাটা থেকে নেমে জঙলের শেষ মাথায় দারুন একটা স্পট পেয়ে গেলাম,উনিও রাজি হলেন।
ওখানেই আমাদের বসতি গাড়লাম। এইত।
আমাদের কথা ত অনেক হল। এবার মূল বিষয়ে ঢুকি।
এখানের মূল জীবিকার উৎস অবশ্যই নিঃসন্দেহে চা পাতা।
পুরোটাই কোম্পানীর আওতায়।কোম্পানি বলতে ফিনলে টি।সব কিছুই তাদের আন্ডারেই এখন।
কয়েকটি ভাগে পাড়ার সবকিছু বর্ননা করব আমি।

⚫জীবিকা নির্বাহঃ
দিন বেসিসে ১০৪ টাকা হারে কাজ করেন বাগানীরা।এদেরকে কামলা বলা হয়।
কাজ শুরু হয় সকাল ৯ টায়।তবে ব্যপার আছে।তাদের ভাষায় একেকজনের একেকদিন একেক লাইনে কাজ পড়ে।
হয়ত একটা লাইন আছে পাড়া থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে,ও’পর্যন্ত কিন্তু তাদের হেটেই যেতে হবে সকাল ৯ টার মাঝে।নয়ত হাজিরা পাবে না।পাতা তোলার মৌসুমে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত পাতা তুলতে হয়।
২৩ কেজি হিসাব।বিকাল ৩ টায় লাইনের মাথায় ট্রাক্টর এসে দাঁড়াবে,সেখানে ওজন করে তুলে দিতে হবে পাতা।
চাইলে অতিরিক্ত ইনকামের ও সুযোগ রয়েছে।

২৩ কেজির পরে প্রতি কেজিতে সাড়ে পাচ টাকা হিসেবে আরো ১০ কেজি পর্যন্ত তুলতে পারবেন তারা,যদি শরীরে কুলোয় আরকি।এরপরে সাড়ে চারটাকা হবে ওটা।এভাবে।
পাতা তোলা ছাড়াও পাতা কেটে দেওয়ার পরে গাছের যত্ন, পানি দেওয়া আরো নানান কাজ করতে হয় তাদের বাকি ৬ মাস।
এছাড়া ঘরের সব থেকে সামর্থ্যবান ব্যক্তি করেন পান তোলার কাজ। না এখানে কোনো পানের বরজ নেই,
গাছের মূল কান্ড বেয়ে বেয়ে প্যেচিয়ে উঠে গিয়েছে পাহাড়ি পান গাছ।
সেই গাছ বেয়ে ওপরে উঠে বাছাই করে করে পান তুলতে হয় তার।

তবে এই পান গাছ এত আশেপাশেও না।বেশীরভাগ গাছগুলোর অবস্থান ই বিভিন্ন পূঞ্জীর ওপরে।এই পাড়া থেকে সবথেকে কাছের পূঞ্জীর দুরত্ব ই প্রায় নয়-দশ কিলোমিটার।
হেটে যেতে হয় হেটে আসতে হয়।পান তুলতে গাছে গাছে উঠতে হয়।বেশ রিস্কের কাজ।তাই বেতন ও কিছুটা বেশী। ৩০০ টাকা দিনপ্রতি।এটাই সাধারনের ভেতরে সবথেকে দামী কাজ।
এছাড়াও আরো যে কয়েকটা কাজ আছে।যেমন তাদের ভেতরে উল্লেখযোগ্য একটা হচ্ছে

প্রতি মাসে মাসে ম্যানেজারের বাড়িতে কাজের জন্যে পাড়া থেকে বাগানী চুজ করা হয়।কাজটা র‍্যান্ডমলী ই করা হয়।বেতন কিরকম হয় তা জানতে পারিনি।তবে এই কাজটা করা হয় বাগানীদের সাথে যেনো ম্যানেজার এবং উপরের পক্ষের সম্পর্ক মজবুত থাকে,নিয়মিত পাড়ার সকল ব্যপারে তারা অবগত থাকে,এমন কিছু কারনে।
আরেকটা যেটা ইন্টারেস্টিং কাজের অংশ দেখলাম সর্দারের উপরে নজর রাখার জন্য ম্যানেজার নাকি নিজের কিছু পছন্দ করা বাগানী নিয়োগ দেয় যাদের কাজ ই থাকে উভয় সর্দার এবং বাগানী কোনোরকম কাজে ফাকি দিচ্ছে কিনা সে ব্যপারে নজরদারীর জন্যে। সে সরাসরি ম্যানেজারের কাছে রিপোর্ট করতে পারে,একাধিক লোকের থেকে একি তথ্য পেলে ফাকি দেওয়া ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে চাকরি চ্যুত ও করা হয়। তবে সেটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে।

তেমন বড় কোনো অঘটন এখন পর্যন্ত এই পাড়ায় ঘটে নি তাই এ ব্যপারে আর বিশদ জানতেও পারিনি।

⚫খাদ্যসঙ্কুলানঃএখানে যে ব্যক্তি চা বাগানে,অর্থাৎ কোম্পানীর হয়ে কাজ করেন শুধু ওই ব্যক্তিকে মাসে ৩ কেজি আটা রেশন দেওয়া হয় প্রতি সপ্তাহে।তাদের ভাষায় পারম্যান রেশন।
ব্যপারটা প্রতি সপ্তাহে কেনো হয় তা ঠিক জানিনা,হয়ত খাবার প্রিজার্ভের উপায় নেই তাই, তবে সবকিছুই এখানে সপ্তাহ বেসিসে হয়।
ছুটির দিন এখানে প্রতি রবিবার।
যেহেতু ডেইলী বেসিসে কাজ করে সবাই তাই রবিবার তাদের ফাকা দিন,কাজ নেই টাকাও নেই।
তবে একটা জিনিষ খুব অবাক করেছে আমায়।লোকাল বাজারে শাক সবজি ফলমূলের দাম।
আমরা তিন বেলার বাজার করেছিলাম একবারে।

টমেটো,পুইশাক,বেগুন,আলু,সিম,পেয়াজকলি,ধনেপাতা কিনতে আমাদের খরচ হয়েছিলো ২০ টাকা!!!প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি,ভেবেছি ভুল শুনেছি,কিন্তু পরে ব্যপারটা বুঝতে পেরে বেশ তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম।
ব্যপারটা আসলে স্বাভাবিক,হাত বদল হচ্ছে না,ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট নেই,দালালি নেই,কানো মাধ্যম নেই,কৃষক সরাসরি বিক্রি করছেন।তাছাড়া এখানের আয় অনুপাতেই ত ব্যয় করবে সবাই তারা,তাইনা!প্রিজার্ভ করে রাখার ও ত উপায় নেই!
পুরো পাড়ায় মুদীর দোকান আছে সর্বমোট তিনটে।এবং যাদের আছে একমাত্র তাদের ই পাকা বাড়ি আছে!মানে তাদের সম্ভ্রান্ত পরিবার বলেই ধরে নিতে হবে!
⚫বাশের ব্যবহারঃএখানের সকল বাড়ির মূল কাঠামো বাশ আর মাটির।ঘরের ভেতরের অধিকাংশ আসবাবপত্র ই বাশের। এবং ঘরের কর্তা কর্তৃক হাতে তৈরী। কমবেশী প্রতিটা ঘরের উঠোনেই এক কোনায় একটা মাচাং মত থাকে। মাচাং এর ব্যবহার খুব সম্ভবত সিগারেট খাওয়ার জন্যে!উনারা দেখলাম কেউ ই ঘরে সিগারেট খান না!হয়ত এটাই প্রথা!
ঘরের কর্তারাই অবসর সময়ে বসে বসে বাশের আসবাবপত্র গুলো তৈরী করেন।সেখানেই আড্ডা দেন,কেউ কেউ সেখানেই ঘুমান!

⚫যোগাযোগ মাধ্যমঃ
নেটওয়ার্ক কানেক্টিভিটি বলতে গেলে শূন্যেরো নিচে।পুরো পাড়ায় শুধুমাত্র দু’টি স্পটে খুব খুব খুব সামান্য নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়,তাও শুধুমাত্র গ্রামীনফোনের!মানে মোবাইল উচু করে হাটাহাটি করতে থাকলে আরকি!তাও পাড়ার ভেতরে কোথাও পাওয়া যায়না,হেটে বাগানের মধ্যেও বেশ কিছুদূর হেটে গেলে এরপরে সেই স্পট!এখানে নাম্বার টিপে কল করা যায় এই প্রথা চলতে চলতে এখন
এই টিলার নাম ই হয়ে গিয়েছে নম্বর টিলা।দিন রাত সবসময় ই ওখানে একজন না একজনকে হাটাহাটি করতে দেখা যায় একটু নেটওয়ার্ক এর আশায়!
তাও এই উঁচু স্পটগুলো পাড়ার একদম দুই কোনায় অবস্থিত।একটার থেকে অন্যটার দুরত্ব ৪ কিলোমিটার ত হবেই বোধয়!
আমরা যে’কদিন ছিলাম আমাদের এন্ড্রয়েডে 2জি মুড অন করার পরেও কোনোভাবেই নেটওয়ার্ক পাইনি,পরে বাধ্য হয়ে লোকালদের থেকে চেয়ে যার যার বাসায় একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছি প্রতিদিন আমরা ভাল আছি সুস্থ আছি এতটুক ই।

⚫চাপকল এবং টয়লেটঃএখানে পানির বেশ সমস্যা। চাপকল ই একমাত্র ভরসা।
তবে সেই চাপকল বসানোর খরচ ও সব পরিবারের বহনসাধ্য নয়!
নিজের উঠোনে চাপকল এখানে বিলাসীতার পরিচয়!

যাদের অতটুকু সামর্থ্যতে কুলাইনি তারা কোম্পানীর বসানো কলগুলোর উপরেই নির্ভর করেন।তাও বেশ খানিক দূরে দূরে একেকটা কল।সেখান থেকে পানি টেনে আনাও আরেক ঝক্কির ব্যপার।
কমবেশী সবার উঠোনেই ছোট বড় কন্টেনার মত রাখা আছে পানি জমা করার জন্যে।
টয়লেট বলতে টিলার একেবারে কোনার ওই তিনটে গাছের মাঝে ছালার ব্যেড়া দেওয়া একটুখানি গর্ত করা স্থান।এই ই।
যারা খুব বেশী সচ্ছল একমাত্র তাদের ই রয়েছে চাপকলের পাশে টিনের বেড়া দিয়ে উচু করা টয়লেটের স্থান!

⚫ভাষাঃএকটা কথা কিন্তু বলা হয়নি। পাড়াটা কিন্তু পুরোটা বেশ কয়েকটা টিলাতে ভাগ করা!এই ছোট পাড়ার ও আবার দু’টো ভাগ,একটা ভাগে থাকেন বাঙ্গালীরা,অন্যটায় গাড়োরা!মূলত এখানে এই দু’টো জাতির ই বসবাস।
ধর্মগত পার্থক্যের ব্যপারটা পরের পর্বে লিখবো।
ভাষাগত পার্থক্য ও কিছুটা জটিল এখানে।
গাড়োরা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলেন,বাঙ্গালীরা বাংলায়। দু’জাতি ই একে অপরের ভাষা বুঝেন যদিও।তাই ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও কমুনিকেশন গ্যাপ নেই আরকি।
⚫সম্প্রদায় এবং ভাষাঃ
এখানে দুটি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস।
খ্রিস্টান ধর্ম এবং সনাতন বা হিন্দুধর্ম।
অবাক করা ব্যপার হচ্ছে খ্রিস্টান ধর্মের সবাই এখানে গাড়ো, এবং বাংলা ভাষার সবাই হিন্দু!
দু’টি আলাদা সম্প্রদায়ের এখানে এভাবে কিভাবে মিলন হলো এই ব্যপারটা আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় লেগেছিলো তাই এই ব্যপারটা নিয়ে আমি বেশ ঘাটাঘাটি করেছিলাম।
পাড়ার সূচনালগ্নে শুধু গাড়ো পাড়া ছিলো এটি।বেসিকালী এই পাড়ার সূচনা ব্রিটিশ আমলেই হয়েছে।
স্বাধীনতার পরেই ক্রমান্বয়ে বাঙ্গালী কিছু বাগানী এদিকে নিয়ে আসা হয়।ক্রমান্বয়ে বাঙ্গালীদের পরিমান বাড়তে থাকে,অন্যদিকে বংশপরম্পরায় গাড়োদের বসবাস ও একি ধারায় চলতে থাকে।
হিন্দুদের দাহের স্থান বা শ্মশান এবং খ্রিস্টান দের কবরস্থান একেবারে পাশাপাশি ই বলা চলে। দু’টো পাশাপাশি টিলায় দুই সম্প্রদায়ের দেহাবশেষের অবস্থান,তার ঠিক মাঝ বরাবর চলে গিয়েছে পায়ে হাটা একটা রাস্তা,মিলেছে সোজা সামনের বড় চা বাগানটায় গিয়ে।

কবরস্থানে গিয়ে কিছু ৭০-৭৩-৮২ সনের খোদাই করা ক্রস দেখেছি,মানে এই পাড়ার বয়স নিয়ে আর প্রশ্ন করার কোনো যুক্তি ই ওঠে না।
ভাবতেই অবাক লাগে এতখানি ভেতরে ব্রিটিশ কোনো একজন মাস্টার প্লানার আজ থেকে এতবছর আগে এতবড় একটা মাস্টার প্লান করে রেখে গিয়েছে,এই পাড়ার সূচনা করে দিয়ে গিয়েছে যার ধারা বংশপরম্পরায় আজো চলে আসছে!
⚫শিক্ষাঃ এ ব্যপারে এখনো পুরো পাড়া যথেষ্ট পরিমানে পিছিয়ে আছে বলতে হবে।যতটুক অগ্রসর হয়েছে তাও এই রিসেন্টলী।
পাড়ায় একটি মাত্র প্রাথমিক স্কুল রয়েছে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত। এর পরে যদি পড়াশোনা করতে হয় তবে প্রায় ৬ কিলোমিটার হেটে সামনের আরেকটি পাড়ায় উচ্চ বিদ্যালয়ে যেয়ে ক্লাস করে আবার হেটে ফিরতে হবে।
এর উপরে আর ইচ্ছে থাকলেও পড়ার উপায় নেই।স্কুল শিক্ষক শিক্ষিকা সর্বোমোট তিনজন।তিনজন ই এখানের। আমাদের সাথে এখানকার একমাত্র যে শিক্ষিকা,তার সাথে কথা হয়েছে উনি এখানকার সভাপতির মেয়ে।কলেজ শেষ করেছেন এখানকার এক উপজেলা থেকে পড়াশোনা করে গতবছর ই।বলা যায় এখানকার সবথেকে উচ্চশিক্ষিত উনি ই। কিভাবে কলেজে যেতো প্রশ্নের উত্তর যা পেয়েছি তা যথেষ্ট শকিং এবং হার্টটাচিং।
এখান থেকে নিকটস্থ থানায় যাবার জন্য প্রতিদিন সকালে তিনটি লেবুর গাড়ি ছাড়ে,সেই থানা থেকে আবার সি এন জি তে করে উপজেলায়।
শুধুমাত্র তার কলেজের সময়ের কথা মাথায় রেখে একটি লেবুর গাড়ির টাইমিং প্রতিদিন ওই অনুপাতে রাখা হত যাতে গ্রামের একমাত্র কলেজ পড়ুয়া মেয়ের মহাবিদ্যালয়ে যাওয়ার ব্যপার নিশ্চিত করার জন্যে!
কতখানি ভালবাসা!তাইনা!!

উনি যতটুক তথ্য দিলো এখনো পর্যন্ত এই পাড়ার কেউ অন্তত উচ্চ শিক্ষার জন্যে এই পাড়া ত্যাগ করেনি!
⚫অনুষ্ঠানঃ অনুষ্ঠান বলতে বিয়ে আর পূজা/প্রার্থনা।বাংলাদেশের অন্য দশটা গ্রামের মতই স্বাভাবিক নিয়মেই চলে।
উল্লেখযোগ্য কিছু বলতে গেলে আপ্যায়নের ব্যপারটার কথা বলা যেতে পারে। যে বাড়িতে অনুষ্ঠান থাকে সেই বাড়ির উঠোনের চারপাশে লম্বা লম্বা মোটা আকৃতির বাশ ফেলা হয়। বাশের সামনে কিছুটা দুরত্ব রেখে রেখে কলা পাতা।
গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্যে উঠোনে আড়া আড়ি করে আরেকটি বাশ পাতা।
হয়ত অনুষ্ঠানের মধ্যমণী দেখেই তাদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা!
ম্যাস ডাইনিং এর প্রাচীনতম ব্যবস্থা বলা যেতে পারে আরকি।
খাদ্যগ্রহনকারীরা বাশের ওপরে বসে মাটিতে হাটু রেখে সামনের থালায় দেওয়া অন্ন গ্রহন করেন।
ব্যপারটা দেখতেও বেশ উপভোগ্য।

⚫শখঃ
গরু ছাগল কমবেশী প্রতি পরিবারের ই থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
তবে বেশীরভাগ বাঙ্গালী গরু ছাগল এবং বেশীর ভাগ গাড়োরাই শুকর পালেন।
এটা স্বাভাবিক।
তবে অস্বাভাবিক হচ্ছে বেশীরভাগ ঘরে ঢোকার মুখে ই টিয়াপাখির দেখা মেলে! তাও খাচার ভেতরের টিয়ে না।খোলা একটা বাশের দোলনা মত বানিয়ে তার উপরে টিয়া বসা একটা।এক পায়ে শেকলের ছোট রিং পড়ানো।উড়ে না যাওয়ার ব্যবস্থা আরকি।
তবে যে ক’টা বাড়িতে গিয়েছি বেশীরভাগ বাড়িতেই টিয়ার অস্তিত্ব মিলেছে।এমন একটা দারুন শখের প্রচলন যে ঠিক কিভাবে হলো তা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি।তবে ব্যপারটা খুব ই চোখে পড়ার মত।

⚫সাউন্ডবক্সঃএখানের এই ব্যপারটা আমার পুরোপুরি অন্যরকম লেগেছে দেখেই আলাদা পয়েন্টে এ ব্যপারে উল্লেখ করছি।
এখানের রীতি অনুযায়ী যে অনুষ্ঠানে যত বড় বাতাস অলা যন্ত্রের ব্যবস্থা করা হবে সেই অনুষ্ঠান তত বেশী ভাল হয়েছে বলে ধরা হবে।
হ্যা বলছি বলছি।
বাতাস অলা যন্ত্র মানে হচ্ছে বিরাট বিরাট সাউন্ডবক্স গুলো আরকি।
এই সাউন্ডবক্স গুলো অনুষ্ঠানের কমপক্ষে দু’দিন আগে আনা হয় এবং বিরতীহীন ভাবে চলতেই থাকে।
মজার ব্যপার হলো এখানের সকল মিউজিক,সকল ধরনের গানের প্রধান বস্তু হচ্ছে বিট। যেই গানের বিট যত বেশী সেই গান তত বেশী জনপ্রিয়!গান বলতে সব ই মাথা ধরা সব ডিজে মিক্স আরকি!

⚫কর্জঃ অন্য সব পাড়া থেকে কর্জ বা ঋণ দেওয়ার প্রথাটা এই পাড়াকে পুরোপুরি আলাদা করে রেখেছে।
প্রতি রবিবার সকাল দশটা থেকে দুপুর দু’টো পর্যন্ত কোম্পানীর একজন লোক বসেন গ্রামের ঠিক মাঝ বরাবর।
প্রয়োজনীয় কারন দর্শায় ৬-৮-১২ মাসের চুক্তিতে বিনা সুদে লোন দেয়া হয় তাদের।লোনের পরিমান ২০ হাজার থেকে ৫০হাজার পর্যন্ত হয়।
প্রয়োজনীয় কারন বলতে কারন ই আছে মোটে তিনটে।
১.বিয়ে
২.ঘর তোলা
৩.অসুস্থতা

এমন বিনা সুদে এমন লোন কোনো পাড়ায় দেয় আমার চোখে এখনো পড়ে নি।
এইত।আমার জানা যতটুক ছিল সবটুকুই লেখে ফেললাম।
এবার তবে বিদায়!

🚩ট্যুরে বের হলে সবসময় আমার ব্যাগের বোতল রাখার একটা পকেট সবসময় ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করি।শুকনো খাবারের প্যকেট,কাগজ,পলিথিন ব্যবহারের পরে ওখানেই রেখে দি। পথিমধ্যে যখন কোনো ডাস্টবিন পাই তখন সেখানে ডাম্প করে দি। এই চটজলদি আইডিয়া টা কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন।
মনে রাখবেন প্রকৃতি কিন্তু “মা” ❤
বাল্মীকি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

কুয়াকাটা ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।

Wed Mar 31 , 2021
আমরা গিয়েছিলাম ৭ জন। সবাই আগের দিন রাত পর্যন্ত অনিশ্চিয়তার মধ্যে থাকার পরও পরদিন সদরঘাট চলে গেলাম। খাবারের পর্বটা সেরে সন্ধ্যা ৬.৩০ টার ঢাকা-বগা-পটুয়াখালী লঞ্চে উঠে গেলাম, লঞ্চে উঠার আগে রাতের জন্যে কিছু নাস্তা কিনে নিলাম কারণ লঞ্চে জিনিসের দাম অনেক বেশি। শুধুমাত্র এরকম লঞ্চ জার্নি উপভোগ করার জন্যে হলেও […]
কুয়াকাটা ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।