উত্তরে একটা এক সপ্তাহের চক্কর দেয়ার ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের।

উত্তরে একটা এক সপ্তাহের চক্কর দেয়ার ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের। কিন্তু সময়, সুযোগ আর সবচেয়ে বড় কথা সঙ্গীর অভাবে হয়ে উঠছিল না। অবশেষে এই বছরে এসে সেই প্লান বাস্তবায়ন করার সুযোগ হল। তবে সেটা পাচ দিনের জন্য। আফসোস না রেখে বেরিয়ে পড়লাম। পাচ দিনে টার্গেট পাচটা জেলা- দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নওগা, রাজশাহী আর চাপাই নবাবগঞ্জ। মূল ইচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখার। সেই সাথে উত্তরের মানুষজন আর প্রকৃতিও দেখব।

প্লানটা সাত দিনের হলে ভালো হত, শীতের মাঝখানে হলে ভালো হত আর আরও এমন টুকিটাকি ‘ভালো হত’ কে পাত্তা না দিয়ে বের হয়ে পরলাম। কারণ পরে যে এমন সুযোগ আবার হবে তার কোনই নিশ্চয়তা নেই। নির্দিষ্টদিনে রাত সাড়ে আটটার দিকে এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে রওনা দিলাম আমি আর রেজওয়ান। আসলাম আমাদের সাথে যুক্ত হল আহসানগঞ্জ থেকে মাঝরাতে। ভোরবেলায় নেমে পড়লাম পার্বতীপুর স্টেশনে৷ এখানে সাদিকের বাসায় ব্যাগ বোচকা রেখে দিনাজপুর ঘুরব। ঘুরেফিরে আবার পার্বতীপুর এসে রাতে সাদিকের বাসায় থাকব- এই ছিল আমাদের প্রথম দিনের প্লান।

সাদিকের বাসায় ব্যাগ রেখে রওনা হলাম কান্তজীউ মন্দিরের দিকে। পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর হয়ে যাওয়ার চেয়ে সৈয়দপুর হয়ে যাওয়াটা আমাদের কাছে বেশি ভালো বলে মনে হল।
উত্তরে একধরণের ছোট রিকশাভ্যান যাত্রী পরিবহন করে। এই ভ্যানগুলো যানবাহন হিসেবে আমার কাছে খুব ভাললাগে। মোটামুটি স্বল্প দূরত্বে যেতে আমি এইটা প্রিফার করি। উত্তরে আসলে তাই ভ্যানে অনেক চড়া হয়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। ভ্যানে চড়েই রওনা দিলাম সৈয়দপুরের দিকে। পার্বতীপুর থেকে সৈয়দপুরের রাস্তা একদম মসৃণ। দেখে মনে হচ্ছিল বেশিদিন হয়নি বানিয়েছে। রাস্তার দুই ধারে অসংখ্যা বড় বড় গাছ আর দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত। সেই সাথে আরো অন্যান্য ফসলের ক্ষেত আছে মাঝে মাঝেই। সব মিলে সবুজের নানা শেডের অসাধারণ কালার প্যালেট এর মত লাগছিল৷ আর সেইসাথে হালকা ঠান্ডা বাতাস মন জুড়ানোর সাথে হাড়ও কাঁপাচ্ছিল।

সৈয়দপুর বাস টার্মিনালে এসে দেখলাম শুঁটকির বাজার। ছোটবড় নানারকম মাছের শুঁটকি বস্তায় সাজিয়ে কিংবা ঝুলিয়ে ক্রেতা খুঁজছে বিক্রেতারা। মূলত পাইকারি খদ্দেররাই এখান থেকে শুঁটকি কিনে নিয়ে যায় যদ্দূর দেখলাম।
সৈয়দপুর থেকে ঠাঁকুরগাও এর বাসে উঠলাম। যাব দশমাইল নামক একটা জায়গায়। আগের রাতে ট্রেনে না ঘুমানোর কারণে এই রাস্তা পুরোটাই ঝিমাতে লাগলাম। তাই আশপাশ আর বিশেষ কিছু দেখা হয় নি। দশমাইল নেমে আবার ভ্যানে উঠলাম কান্তজীউ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। আপনারা যারা দিনাজপুর থেকে আসবেন তারা কান্তনগর মোড়ে নামবেন। যাইহোক, দশমাইল থেকে কান্তনগর মোড় হয়ে হাইওয়ে ছেড়ে বামে ঢুকে গেলাম।

বামে ঢুকতেই সবার প্রথমে একটা ব্রীজ পড়ে। নদীর নাম ঢ্যাপা নদী৷ ব্রীজ পার হয়ে কিছুদূর এগুতেই পর্যটন কর্পোরেশন এর উদ্যোগে স্থাপিত জাদুঘর। তারপর ক্যান্টিন আর তারপরই মন্দিরের প্রাঙ্গন। রাস্তা থেকে খানিকটা চোখে পড়ে মন্দির। তবে মন্দিরের বাইরে বিশাল চত্বর জুড়ে হরেক রকম দোকান। সেগুলো পেরিয়ে একটা দরজা পার হতে হয় মন্দিরের সামনে পৌঁছুতে। যদি পুরনো দালানকোঠা আপনাকে আকৃষ্ট করে তাহলে প্রথম দেখায় আপনার মুখ হা হতে বাধ্য, আগে যত ছবিই দেখেন না কেন। গেট পার হয়েই আমারও সেই দশাই হয়েছিল।

কান্তজীউ মন্দিরের যে জিনিসটা আমাকে সবার প্রথম আকৃষ্ট করে সেটা হল এর বিশালতা আর পোড়ামাটির কারুকার্য। বিশাল দালান দেখেছি, বিশাল পুরনো দালানও দেখেছি৷ কিন্তু এই প্রথম এরকম পুরো গায়ে অসংখ্য পোড়ামাটির কারুকার্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম কোন বিশাল দালানকে। চওড়ায় খুব বেশি না, কিন্তু ছোট একটা দরজা দিয়ে ঢুকে যখন এত বড় একটা দালান দেখবেন, তখন সেটিকে আরও বিশাল মনে হবেই।
দিনাজপুরের তৎকালীন জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের নির্মানকাজ শুরু করেন ১৭০৫ সালে। তবে তিনি তার জীবদ্দশায় নির্মাণকাজ শেষ করে যেতে পারেননি। তার পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ করেন। কান্তজীউ মন্দির কালিয়াকান্ত জীউ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের জন্য নিবেদন করে তৈরি।এই মন্দির স্থাপনের সময় শ্রীকৃষ্ণের যে মূর্তিটি স্থাপন করা হয় তা আনা হয়েছিল বৃন্দাবন থেকে।

নির্মাণের সময় এই মন্দিরটির উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। মন্দিরটির নয়টি চূড়া ছিল যেগুলোকে একত্রে নবরত্ন বলা হত। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে মন্দিরটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং চূড়াগুলো ভেঙে যায়। পরে মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরটি সংস্কার করলেও চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয় নি। তাই এখন আমরা এর পুরো সৌন্দর্যটা দেখতে পারি না। উইকিপিডিয়াতে ১৮৭১ সালের একটি ছবি আছে যেখানে এর চূড়াগুলো দৃশ্যমান। মন্দিরের প্রাঙ্গণে একটি গাছের সাথেও পুরাতন একটি ছবি ঝুলানো আছে যাতে এর চূড়াগুলো বিদ্যমান।

পুরো মন্দিরজুড়ে প্রায় পনের হাজার পোড়ামাটির ফলক রয়েছে যেগুলোতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য অনেক পৌরাণিক কাহিনী চিত্রিত আছে। এছাড়াও সমসাময়িক মানুষদের জীবন আর অভিজাত শ্রেণীর শিকারের দৃশ্যসহ আরো অনেক কিছুই চিত্রিত আছে এই টেরাকোটাগুলোতে। কান্তজীর মন্দিরের টেরাকোটাগুলো অত্যন্ত উৎকৃষ্টমানের। তাই বেশিরভাগ টেরাকোটাই এখনো আগের মতই আছে। খুব বেশি ক্ষয় হয় নি।
কান্তজীর মন্দিরের চারদিকে ঘেরা ইংরেজী O আকৃতির একতলা আধাপাকা দালান। মন্দিরের দেখাশোনা যারা করেন তারাই মূলত এখানে থাকে। সাথে একটি শিবমন্দিরও আছে।
কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে বের হয়ে এলাম। এবারে গন্তব্য নয়াবাদ মসজিদ। চা খেয়ে ভ্যানে করে রওনা হলাম নয়াবাদ মসজিদের দিকে। দুইধারে আমের বাগান, মধ্য দিয়ে পিচঢালা রাস্তা। খানিকক্ষণ পরেই এসে নামলাম নয়াবাদ মসজিদের গেইটে। গেইট পেরিয়ে ঢুকতেই বিশাল প্রাঙ্গণ। এর মাঝেই বাম দিকে দাঁড়িয়ে আছে নয়াবাদ মসজিদ।

নয়াবাদ মসজিদ নাকি নির্মাণ করা হয়েছিল কান্তজীর মন্দির নির্মাণে আসা মুসলিম শ্রমিক ও স্থপতিদের নামাজ পড়ার জন্য। এদিকে আবার আমি ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে পেয়েছিলাম যে এই মসজিদের প্রধান প্রবেশপথের উপরের প্রস্তরফলকে ফারসি ভাষায় লিখা আছে এটি তৈরি করা হয় ১৭৯৩ সালে। যেহেতু কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণকাজ ১৭৫২ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল তাই ব্যাপারটা বেশ কনফিউজিং।

নয়াবাদ মসজিদ এর ছাদে তিনটি গম্বুজ আর চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে। এর দেয়ালগুলো বেশ পুরু, প্রায় ১ মিটারের বেশি। এই মসজিদটি তৈরির সময়ও প্রচুর টেরাকোটা ব্যবহৃত হয়েছিল যার বেশিরভাগই এখন নেই। ১০০ টির মত অবশিষ্ট টেরাকোটা রয়েছে যার বেশিরভাগই সম্পূর্ণ অক্ষত নয়। মসজিদটি সংস্কার করে নতুন রঙ করা হয়েছে সেটা বুঝতে পারলাম পেছনের দিকে গিয়ে। ভূমিকম্প কিংবা যে কারণেই ক্ষতি হয়ে থাক না কেন, সে দাগ বেশ স্পষ্ট।
মসজিদটির ভেতরের দেয়ালেও সেই ক্ষতের খানিকটা দেখা যায়। কিছুটা সবুজ হয়ে এসেছে দেয়ালের কোন কোন জায়গায়। এর মাঝেই মাঝখানের মিম্বরটায় একটা নকশা। আরও অনেক ছিল বুঝা যায়, তবে এখন আর নেই।
নয়াবাদ মসজিদ থেকে বেরিয়ে ফের ভ্যানে চেপে বসলাম। এবারে গন্তব্য দিনাজপুর শহর। তবে ভ্যান আমাদের নিয়ে যাচ্ছে কান্তনগর মোড় পর্যন্ত৷ সেখান থেকে বাসে করে দিনাজপুর। তবে কান্তনগর নেমে ঠিক করলাম সিএনজিতেই যাব। কারণ বাসে কারো পা ই ঠিকঠাকমত রাখতে পারছিলাম না। স্পেস কম।

সিএনজি আমাদের নামিয়ে দিল দিনাজপুর সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এ। সেখান থেকে অটোতে করে চলে এলাম দিনাজপুর জমিদারবাড়ি।
দিনাজপুরের জমিদারি ছিল বাংলার সবচেয়ে বড় জমিদারিগুলোর একটি। এই জমিদারির বিশালতা দেখে সম্রাট আওরঙ্গজেব দিনাজপুরের জমিদার সুখদেবকে ১৬৭৭ সালে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। সুখদেব উত্তরাধিকারসূত্রে মামার কাছ থেকে জমিদারি পেয়ে আরও সম্প্রসারণ করেন। ১৭৯৩ সালে যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন করা হয় তখন এই জমিদারি ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম জমিদারি।

দিনাজপুর রাজবাড়ি ঠিক কবে এবং কে স্থাপন করেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন দিনাজপুর রাজবাড়ি স্থাপন করেন রাজা দিনাজ। অন্যদিকে কারো কারো মতে রাজা গণেশ এই রাজবাড়ি স্থাপন করেন।
দিনাজপুরের রাজবাড়িটি মূলত তিনটি ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত- আয়না মহল, রাণী মহল ও ঠাকুরবাটি মহল। এর মধ্যে ঠাকুরবাটি মহল অংশটি সংস্কার করে দেখাশোনা করা হচ্ছে। প্রতিবছর এখানে কান্তজিউ ও দুর্গাপূজা করা হয়। বাকি আয়না মহল ও রাণী মহল এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে এখানে এলে সেই রাজকীয় স্থাপত্যশৈলীর অনেকটা চোখে পড়ে। মলিন হলে কি হবে! রাজকীয়তা তো রাজকীয়তাই৷
দিনাজপুর রাজবাড়ির মূল অংশের ভেতরে বিশাল পুকুর আর বাস করার দালানগুলো ছাড়াও মন্দির, পানির ট্যাংকি, টেনিস কোর্ট, বাগান ইত্যাদি ছিল। এখন অবশ্য মন্দির, পুকুর আর বড় বড় দালানগুলো ছাড়া কোন কিছুরই তেমন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

ঠাকুরবাটি মহলের খানিকটা ঘুরাঘুরি করে চলে এলাম রাজবাড়ির পেছনের দিকে। বাইরের সিএনজি-অটোর হর্ণ আর অন্যান্য শব্দ কান থেকে মিলিয়ে যেতেই শুনতে পেলাম নানারকম পাখি আর পোকামাকড়ের চিৎকার। এর মধ্যেই ঢুকে গেলাম প্রথম ভাঙাচোরা দালানটায়। হয়তো আয়না মহল, কিংবা রাণী মহল।
নাম যেটায় হোক না কেন, জায়গাটা একেবারে মনের মত ছিল। আমরা তিনজন ছাড়া কেউ নেই আশেপাশে। মাঠের চারপাশে দোতলা ভাঙা দালান। এখন জীর্ণশীর্ণ শ্রীহীন হলেও এককালে ছিল আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। দালানের গায় হা করে আছে দরজাবিহীন একেকটা চৌকাঠ। যেন হুট করেই এক অন্য রাজত্বে এসে পড়েছি যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে কোন ভয়ংকর জাদুকর৷ অবহেলা অযত্নে তাই খসে পড়েছে দেয়ালের পলেস্তারা, বেরিয়ে পড়েছে নগ্ন ইট।

এরই মধ্যে দিয়ে ফাঁকফোঁকর খুঁজে দোতলায় উঠে গেলাম। সেখান থেকে পুরো জায়গাটা দেখতে আরও সুন্দর লাগছিল। তবে খুব বেশিদিন যে এগুলো টিকবে না তা বোঝাই যাচ্ছিল। সংস্কার তো দূরের কথা, নূন্যতম যত্নআত্তিও করার কেউ নেই।

আরও ভেতরের দিকে গেলাম, আরও অজস্র ভাঙা দালান চোখে পড়ল। তবে ভেতরের দিকের একটা দালানে এখনো মানুষ থাকে। বেশ পরিষ্কার আর অন্যগুলোর তুলনায় বেশ আলাদা একটি দালান সেটা। কথা বলার মত কাউকে পাইনি তাই কিছু জানাও হয় নি। পাশেই রাজবাড়ির পুকুর। তবে পুকুরঘাট থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে আসছিল বিধায় ওদিকে আর আগাইনি।
এর মধ্যেই দুপুর হয়ে এসেছিল। তাই ক্ষুধা পেটের মধ্যে তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। দুপুরের খানা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল রুস্তম হোটেলে। তাই অটো নিয়ে ইদগাহ মাঠের পাশের রুস্তম হোটেলের দিকেই রওনা হলাম।
নামের তুলনায় রুস্তম হোটেলের দর্শনদারী তেমন ভালো না হলেও গা করলাম না তেমন। কারণ অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে এরকম সাধারণ দেখতে হোটেলেই বেশিরভাগ সময় অসাধারণ কিছু খাবার পাওয়া যায়। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে বসতেই ভাতের প্লেট হাজির। সেইসাথে কিছু বলার আগেই একবাটি করে গরুর মাংসও দিয়ে গেল। অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে গেছে গরুর মাংসের নাম শুনে সেটাই নেব।

খাবারটা বেশ ভালোই ছিল। গরুর মাংস বললেও সেটাকে গরুর কালাভূনা বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। মাংসগুলো বেশ ভালোভাবেই রান্না হয়েছিল। খুব সহজেই ছাড়ানো যাচ্ছিল। অন্য অনেক জায়গার মত যুদ্ধ করতে হচ্ছিল না মাংস ছিড়তে। কলিজাও অর্ডার করলাম। সেটার টেস্টও বেশ ভালো ছিল। পেটপুরেই খেলাম একদম।
খেয়েদেয়ে রওনা দিলাম রামসাগর জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশ্যে। রামসাগর নামের একটা বিশাল দিঘী আর এর আশেপাশের খানিকটা জঙ্গল- এই নিয়েই রামসাগর জাতীয় উদ্যান। দিনাজপুরে এলে খানিকটা সময় কাটানোর জন্য চমৎকার একটা জায়গা। প্রবেশ ফি দশ কিংবা বিশ টাকা।

দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রামসাগর বাংলাদেশের মানবসৃষ্ট দীঘিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। ১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে দিনাজপুর জমিদারির তৎকালীন জমিদার মহারাজা রামনাথ রায় প্রজাদের পানির অভাব দূর করতে এই দিঘীটি খনন করেন। দিঘীটি খনন করতে প্রায় ৩০০০০ টাকা প্রয়োজন হয়েছিল। ১৫,০০,০০০ শ্রমিক মিলে ১৫ দিন এ দিঘীটি খনন করা হয়।
এই দিঘীটি নিয়ে একটি লোককাহিনী শোনা যায়। দিঘীটি খনন করার পর নাকি এতে পানি উঠছিল না। পরে রামনাথ স্বপ্নে দেখেন এই দিঘীতে কেউ প্রাণ বিসর্জন দিলে তবেই পানি উঠবে। তখন রাজার নির্দেশে এক স্থানীয় যুবক প্রান বিসর্জন দেয় এই দিঘীতে। যুবকের নামও রাম ছিল। পরে তার নামেই দিঘীটির নামকরণ করা হয় রামসাগর। তবে এর কোন সবল ভিত্তি পাওয়া যায় না।

রামসাগর দিঘীকে কেন্দ্র করে প্রচুর গাছপালা রয়েছে। ২০০১ সালে একে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। দিঘীটি ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, পিকনিক কর্ণার, ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা পাঠাগার ইত্যাদি।
রামসাগর পৌঁছে আমাদের প্রথম কাজটা ছিল একটা ভ্যান নিয়ে বিশ্রাম করার একটা জায়গা খুঁজে বের করা। একটা সিমেন্টের ছাউনি খুঁজে নিয়ে ঘন্টাখানেকের মত বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। এটার দরকার ছিল কারণ সারারাত না ঘুমিয়ে আবার সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে খানিকটা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সাথে গামছা ছিল না তাই, নইলে রামসাগরে গোসলটাও সেরে নিতাম অবশ্যই।

এরপরে আবার ভ্যানওয়ালা মামাকে ফোন দিয়ে আনালাম বাকি অংশ চক্কর দেয়ার জন্য। বাকি অংশ বলতে দিঘীর পাড়টাই। এর মাঝে উদ্যানের চিড়িয়াখানায় গিয়ে চিড়িয়া দর্শনও করলাম। চিড়িয়া বলতে হরিণের পাল, একজোড়া তিতির, চারটা বানর, একটা হনুমান, একটা ময়ুর আর একটা অজগর- এই। চিড়িয়াখানার মতই জীর্ণশীর্ণ প্রানীগুলোর অবস্থাও।
রামসাগর জাতীয় উদ্যান থেকে বের হয়ে আবার চললাম দিনাজপুর শহরের দিকে। কাছেই ঘুঘুডাঙা জমিদারবাড়ি ছিল। কিন্তু এখানে অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলায় আর জমিদারবাড়ি গেলাম না। দিনাজপুর থেকে বাসে উঠে সোজা চলে এলাম পার্বতীপুর। আজ রাতে এখানেই সাদিকের বাসায় থাকা হবে। সেইসাথে শেষ হল আমাদের উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের প্রথম দিন আর প্রথম জেলা- দিনাজপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

মজার একটা তথ্য শেয়ার করি

Wed Mar 31 , 2021
মজার একটা তথ্য শেয়ার করি, আপনি কি জানেন টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন শিপের ভ্রমণ করার সময় জাহাজ থেকে পাখিকে কোনপ্রকার চিপ্স না দেওয়ার জন্য একটা নিষেধাজ্ঞা আছে ।। জাহাজ কর্তৃপক্ষ আপনাকে বারবার সতর্ক করবে, যদি না শুনেন তাহলে আপনার ছবি তুলে প্রশাসনকে দেওয়ার হুমকি দিবে। কমন ব্যাপার তাই না ভাবছেন এখানে […]
মজার একটা তথ্য শেয়ার করি