রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ১২:২৪ অপরাহ্ন

শাহপরীর দ্বীপে ভ্রমণ ও ক্যাম্পিং

শাহপরীর দ্বীপে ভ্রমণ ও ক্যাম্পিং

শাহপরীর দ্বীপে ভ্রমণ ও ক্যাম্পিং

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে ভূখণ্ডের সাথে লাগানো শেষ বিন্দু এই শাহপরীর দ্বীপ। টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন এই শাহপরীর দ্বীপ, স্থানীয়রা বলে “সাবের ডি”। আমার একজন ভ্রমণসঙ্গী বললো সে শাহপরীর দ্বীপে ক্যাম্পিং করতে চায়🙄। আমি যেহেতু আগে শাহপরীর দ্বীপ যায়নি এবং হাতে সময় ও আছে তাই রাজি হয়ে গেলাম। সমস্যা বাধলো অন্য জায়গায়; শীতকালে ক্যাম্পিংয়ে স্লিপিং ব্যাগ প্রয়োজন কিন্তু সেটা আমার কাছে আপাতত নাই। তাই আমাদের বিদেশী বন্ধু “জানা” এর কাছ থেকে স্লিপিং ব্যাগ ধার নিলাম।
নির্ধারিত দিন সকাল ৬ টায় তুহিন ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছালো। আমি ও ভোরে ঘুম থেকে উঠে কলাতলি চলে গেলাম। তারপর দুজন মিলে নাস্তা সেরে জানার কাছ থেকে স্লিপিং ব্যাগ নিলাম। এখন হিচহাইকিং করে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফ যাবো ফ্রিতে। একটি কাগজে টেকনাফ – Teknaf লিখে কলাতলি মোড়ে হিচহাইকিং এর সিগনাল দিতে লাগলাম। প্রায় ১৫ মিনিট পরে র্যাবের একটি গাড়ি আমাদের দেখে থেমে গেলো। আমরা কাছে গিয়ে বললাম 💁‍♂️ আমরা ভ্রমণকারী এবং হিচহাইকিং করে টেকনাফ যাবো! আপনাদের যদি কোন অসুবিধা না হয় তাহলে আমাদের টেকনাফ পর্যন্ত লিপ্ট দিতে পারেন!” তারা সানন্দে রাজি হয়ে গাড়িতে উঠার জন্য বললো। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে পরলাম। তারপর পরিচিত হলাম একে-অপরের। তাদেরকে চকোলেট খেতে দিলাম ‘যেগুলো আমাদের ব্যাগে সবসময় থাকে’। অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ হলো। যদিও ভ্রমণ বিষয়ক আলাপ হলো বেশি।
মেরিন ড্রাইভের নয়ানাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সামনের এক তরমুজ খেতের সামনে তারা গাড়ি দাড় করালো। জিজ্ঞেস করাতে বললো “আপনাদের তরমুজ খাওয়াবো” কিন্তু পরিতাপের বিষয় তরমুজ চাষি বললো ‘তরমুজ এখনো পাকে নি’। হতাশ হয়ে আবারো গাড়িতে উঠে পরলাম। প্রায় ১ ঘন্টা ১০ মিনিট পর টেকনাফ বিচে পৌঁছে গেলাম। এবার র্যাবদের বিদায়ের পালা। তারা আমাদের দুজনকে কপি খাওয়ালো স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে থেকে। বাহ কি চমৎকার 😋 তারপর তাদের বিদায় দিয়ে আমাদের শাহপরীর দ্বীপ যাওয়ার পালা। কিন্তু প্রায় ৩০ মিনিট সিগনাল দিয়ে ও কোন গাড়ি পেলাম না। তাই একটি টমটম নিয়ে কাঁচা মেরিন ড্রাইভ হয়ে শাহপরীর দ্বীপ গেলাম। মাঝপথে লবণমাট, সাদা বক, শুটকি শুকানোর দৃশ্য ও সাগরে ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করা হলো।
শাহপরীর দ্বীপে জেটিতে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এই জেটি দিয়েই মায়ানমার থেকে গরু প্রবেশ করে বাংলাদেশে। ঐ দূরে মায়ানমারের মংডু শহরের গ্রাম দেখা যাচ্ছে। নাফ নদীতে গাংচিল ঝাঁক বেধে বসে আছে। সময় এখন দুপুর ১ টা, খিদে ও লেগেছে অনেকখানি। শাহপরীর দ্বীপের গ্রামের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ পাড়ার বেড়িবাঁধের মসজিদের সামনে চলে আসলাম। গ্রামের লোক আমাদের ডিবির লোক বা সাংবাদিক মনে করছে😋। কয়েকজন এসে জিজ্ঞেস ও করলো। স্থানীয় জাফর ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। আমাদের ক্ষিধে লেগেছে শুনে তার বাসায় খাওয়ার প্রস্তাব দিলো। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ১০ মিনিট পর রুপচাঁদা মাছ, ডিম ভাজি, আলু ভর্তা ও সাদাভাত নিয়ে হাজির। এর মধ্যে তার ছেলে ফরিদকে দিয়ে ডাব গাছ থেকে ২ টি ডাব পাড়া হলো। জাফর ভাইয়ের দোকানে বসেই দুপুরের খাবার তৃপ্তি সহকারে খেলাম। তারপর ওনার দোকান থেকে মায়ানমারের কপি মিক্স খেয়ে শরীর চাংগা করে নিলাম। ব্যাগ ওনার দোকানে রেখে শাহপরীর দ্বীপ উপভোগ ও ক্যাম্পিংয়ের স্থান ঠিক করার জন্য বেরিয়ে পরলাম।
বেড়িবাঁধ পার হয়ে বিজিবির সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করলাম ‘যদিও সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’। কিন্তু আমরা বিজিবির কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়েছিলাম। আমরা এখন বাংলাদেশের সাথে লাগানো ভূখণ্ডের শেষ বিন্দুতে। এখানে ৬০ ফিটের একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে। যদিও এটি পরিত্যক্ত। ২ জন বিজিবি সদস্য ২৪ ঘন্টা পালা করে বাইনোকুলার দিয়ে নজর রাখে সমুদ্রে ও মায়ানমার সীমান্তে। শেষ বিন্ধুর সমুদের নীলাভ জল, নারিকেল গাছের বাগান, বোট বানানোর দৃশ্য অবলোকন করছি আর ভাবছি🤔
“আমি সমুদ্র দেখবো বলে হেটে হেটে বহুদূর চলে যাই🚶‍♂️
কোন এক রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকি জীবনকে সাক্ষী রেখে” 🌼
বিকেল সাড়ে ৪ টায় জাফর ভাইয়ের দোকানে এসে ফ্রেশ হয়ে ডাবের পানি খেলাম। তারপর আবারো বেড়িবাঁধ দিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগলাম। এলাকার ছেলেদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে তিন মাথা রাস্তার বাজারে চলে আসলাম। বাজারে পরোটা-হালুয়া, ছোলা-মুড়ি ও চা খেয়ে টমটম করে জাফর ভাইয়ের দোকানে চলে আসলাম। এখন ক্যাম্পিং করার পালা। বিজিবির কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে তাঁবু বসালাম। রাত এখন ১০ টা। তাঁবুতে বসে বসে সমুদ্রের গর্জন, তারার ঝিলিমিলি অবয়ব, অর্ধচন্দ্র চাঁদের জ্যোৎস্না উপভোগ করতে করতে মনের অজান্তেই উচ্চারিত হলো 🙄
“মধ্যরাতের আকাশে উঁকি দিয়ে দেখি;
শুকতারাটার মন ভালো নেই,
অদূরে হেসে যাচ্ছে চাঁদ
এদিকে রাত্রিরা সঙ্গীহীন!”
আমি আর তুহিন আড্ডা দিচ্ছি। জাফর ভাই স্থানীয় পান নিয়ে এসেছে। আমিও খুব আগ্রহ নিয়ে মুখে দিলাম। ওমা😳 এই পান এত ঝাল যে আমার চোখে পানি এসে গেছে, তাছাড়া অতিরিক্ত জর্দায় আমার মাথা ঘুরতে লাগলো। ২ মিনিট পর বমি করে দিলাম। এবার কিছুটা ভালো লাগছে। তারপর স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে ঘুমিয়ে পরলাম। ভোর ৬ টায় জাফর ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভেঙে গেলো। তাঁবুর চেইন খুলে দেখি চারিদিকে কুয়াশার চাদরে মোড়ানো সমুদ্রসহ পুরো এলাকা। খালি পায়ে সৈকতের স্নিগ্ধতায় মনমাতানো মৃদু বাতাসের ছন্দে উতালপাতাল মনের গহিনে এক আবেশ সৃষ্টি করেছে। কিছু পর জাফর ভাইয়ের দোকান থকে নুডুলস ও ছোলা খেয়ে সিএনজি নিয়ে টেকনাফ পৌঁছে গেলাম সকাল সাড়ে ৮ টায়। ওখান থেকে তুহিন সেন্টমার্টিন আর আমি মেরিন ড্রাইভ হয়ে কক্সবাজার চলে এসেছি। আর এর মাধ্যমেই শেষ হলো অভূতপূর্ব হিচহাইকিং সহকারে শাহপরীর দ্বীপে ক্যাম্পিং⛺
শাহপরীর দ্বীপ ভ্রমণের পর আমার অভিব্যক্তি🤷‍♂️
🌊এটি যেহেতু বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা তাই সাবধানে যাওয়া উচিত।
🏗️মায়ানমার থেকে যে সকল গরু আসে তা এই শাহপরীর দ্বীপ জেটি দিয়ে আসে।
⛑এখানে বিজিবির খুব কড়া টহল রয়েছে তাই তাদেরকে আপনার পরিচয় পত্র দেখিয়ে অনুমতি নিয়ে নিন।
📇ভ্রমণ তারিখঃ ১৭/০২/২১ ইং থেকে ১৮/০২/২১ ইং
💰ভ্রমণ খরচঃ যেহেতু হিচহাইকিং করে গিয়েছি তাই খরচ হয়েছে জনপ্রতি ৫০০ টাকা (কক্সবাজার টু কক্সবাজার)।
🚖যেভাবে যাবেনঃ সারা বাংলাদেশ থেকে কক্সবাজার আসতে হবে। কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফ (সিএনজি ভাড়া ২০০ টাকা) তারপর টেকনাফ থেকে শাহপরীর দ্বীপ (সিএনজি ভাড়া ১০০ টাকা)।
🗑️আমি ভ্রমণের সময় আমার ব্যাগে সবসময় পলি রাখি, কারণ আমার ব্যাবহৃত বিস্কুট, কেক বা অন্য কোন কিছুর প্যাকেট অথবা ময়লা এই পলিতে রাখি এবং যখনি ডাস্টবিন দেখবো ওখানে এগুলো ফেলে দিবো। এভাবেই পরিষ্কার থাকুক আমাদের বাংলাদেশ 🇧🇩

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Bangalitimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com