রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ০১:২৩ অপরাহ্ন

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

খবরটি আমাকে খুব মর্মাহত করেছে এবং ২০ বছর আগে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ‘তালেবানদের হাতে বন্দি আমি’ শিরোনামে যে স্মৃতিচারণ করেছিলাম সেই পাক-আফগান সীমান্তে নিয়ে গিয়েছে আমাকে। গত ১৬ জুলাই ২০২১ স্পিন বোলডাক-চমন বর্ডার ক্রসিং এলাকা দখলে নিতে গিয়ে তালেবানরা

হত্যা করেছে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় ফটোসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকিকে (৩৮), যিনি সেখানে রয়টার্সের জন্য কাজ করছিলেন। সীমান্তটির দখল নিয়ে আফগান বিশেষ বাহিনী এবং তালেবানদের লড়াইতে নিহত হয়েছেন দানিশ। সে আফগান স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে এমবেডেড জার্নালিস্ট হিসেবে দক্ষিণ আফগানিস্তানের ওই কান্দাহারে গিয়েছিল।

ভাবছিলাম আমি কত সুভাগ্যবান ছিলাম। সেখানে আফগান যুদ্ধের সময় আমি তালেবানদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম শুধু তাই নয়, গাড়ি চালিয়ে তারা আমাকে পাকিস্তানের চমন শহরে রেখে গিয়েছিল। এই সীমান্ত দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সীমান্ত দখলের মাধ্যমে পাকিস্তান

এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের সরাসরি যোগাযোগ, আসা-যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। আফগান জনসংখ্যার ৩৮-৪২ শতাংশই পশতুন, তালেবানরা প্রধানত যে গোষ্ঠী থেকে এসেছে। তারাই সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী সেখানে। সংখ্যায় প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। এপারে পাকিস্তানে রয়েছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক পশতুন, প্রায় চার কোটি ৩৫ লাখ, যেটি পুরো আফগান জনসংখ্যা থেকেও বেশি।

দানিশের জন্য ১৯ জুলাই ঢাকায় ফটো সাংবাদিকরা শোক প্রকাশ করেছেন ঢাকার টিএসসিতে। তার দেশেও অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন। তবে দুঃখজনক হচ্ছে দানিশ সিদ্দিকিকে আফগানিস্তানে একটি কট্টোরবাদী গোষ্ঠী হত্যা করেছে আর ভারতে আরেক কট্টরবাদী গোষ্ঠী আনন্দ প্রকাশ করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে আনন্দের প্রকাশ

ঘটছে। কারণ দানিশ সিদ্দিকি মুসলমান। ভারতের সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন, দিল্লির দাঙ্গা, দিল্লির করোনার বেহাল দশা- সব কিছু ফুটে উঠেছে দানিশের ক্যামেরায়। সুতরাং এই হত্যা আনন্দের ভারতের হিন্দু মৌলবাদীদের জন্য। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদি তার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেননি। মোদি কেন চুপ এই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী এক এমপি।

এদিকে তালেবানদের উত্থানে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন হলেও ভারতের হিন্দু মৌলবাদী সরকারের টেনশনটি বড় আকারে দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব প্রতিবেশি দেশ তার থেকে ছুটে গিয়েছে, আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের পর আফগানিস্তানও ছুটে যাচ্ছে ভারতের হাত থেকে, যখন সেখান থেকে ন্যাটো জোটের সব সৈন্য বিদায় নেবে।

অবশ্য এরই মধ্যে তালেবানরা দেশের এক তৃতীয়াংশ দখলে নিয়েছে, সরকারি বাহিনী মোটামুটি পর্যুদস্ত। সব দেখে মনে হচ্ছে দিল্লির কাবুল-নীতি একেবারে জলে গিয়েছে। দিল্লির টেনশনটি শুরু হয়েছিল অবশ্য গত বছর যখন তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান বৈঠক শুরু হয়েছিল তখন থেকে।

২০০১ সালের আফগান যুদ্ধের পর কাবুল সরকারের চোখে পাকিস্তান হয়ে যায় আফগানিস্তানের শত্রু রাষ্ট্র। ভারত হয় বন্ধু রাষ্ট্র। কাবুল সরকারের সহায়তা পেয়ে ভারত সেখানে ব্যবসা বাণিজ্যে আধিপত্য গড়ে তোলে এবং পাকিস্তানবিরোধী একটা পরিবেশ তৈরি করে,

যা পরবর্তী এক যুগ ছিল বলা যায়। দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান-আফগানিস্তান নানা ঝগড়া-বিবাদ, নরম-গরম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে কাবুল সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এই ঝুঁকে পড়ায় না হয়েছে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কল্যাণ, না এসেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

অন্যদিকে, সরকারি নীতি যাই হোক, তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর যোগাযোগ বরাবরই ছিল। তালেবানদের অবাধ যাতায়াত ছিল পাকিস্তানে। মোল্লা ওমরের তালেবান সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা হারিয়েও বছরের পর বছর দখলে রেখেছে দেশের একটা বিস্তৃত এলাকা, আর ২০ বছর ধরে চলে আসছে সেই যুদ্ধ।

আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী এবং সরকারি বাহিনী—দুটির সঙ্গে লড়ে গিয়েছে তালেবানরা। সর্বশেষ ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে আমেরিকা, কারণ যে হারে তারা তালেবানদের কাছে সৈন্য হারাচ্ছিল, তাতে মানসম্মান দিয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। এর মধ্যে মার্কিনিদের খচর করতে হয়েছে দুই ট্রিলিয়ন ডলার।

পাশাপাশি চীনও ভূমিকা রাখে শান্তি চুক্তি স্থাপনে। তারা কাবুল সরকার, তালেবান আর পাকিস্তানকে এক মঞ্চে আনতে নেপথ্য ভূমিকা রাখে। গত ২৬ আগস্ট ২০২০ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি আফগানিস্তানে নিয়োজিত চীনের বিশেষ দূত লিউ জিয়ানকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করার জন্য

ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তালেবানদের রাজনৈতিক শাখার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বৈঠক হয়েছে কীভাবে তালেবান এবং আফগান সরকার একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে তার রূপরেখা নিয়ে। আর চীন-পাকিস্তানের এই উপস্থিতি ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের উচ্চাভিলাষকে আরও এক ঝাঁকুনির মুখে ফেলে দিয়েছে।

আফগানিস্তান এমন একটি দেশ যাকে বলা হয় ‘সম্রাটদের কবরস্থান’। তাদেরকে সাময়িকভাবে কব্জা করা গিয়েছে কিন্তু সবাইকে শেষ পর্যন্ত পালাতে হয়েছে। সবাই তাদেরকে সভ্যতার ছোঁয়া, শিক্ষা দিতে গিয়েছে কিন্তু তারা তাদের মতোই আছে, অন্যদের পালাতে হয়েছে। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ গিয়েছিল আফগানিস্তান দখল করতে, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গিয়েছিল এবং ২০০১ সালে আমেরিকা গিয়েছিল- সবাইকে একই ভাগ্য করণ করতে হয়েছে।

সময়ের ব্যবধানে এখন তালেবানরা বিশ্বকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে আফগানিস্তানের উন্নয়ন, গঠন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় তালেবানদের বাদ দেওয়া সম্ভব না। প্রতিবেশী ইরান, চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া, পাকিস্তান সবাই একমত যে জাতি গঠনে তালেবানদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা রয়েছে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সেখানে ভারতের কূটনীতি এবং ভূমিকা চরম ব্যর্থ হয়েছে।

অতি সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘এক মাস আগে প্রকাশ্যে আসে যে তালেবানের সঙ্গে গোপনে ও নিঃশব্দে একটি আলোচনার দরজা খুলেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে

এই পদক্ষেপের সমর্থনে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানকে আফগানিস্তান তথা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সন্ত্রাসমঞ্চ থেকে দূরে রাখতেই এ উদ্যোগ। কিন্তু এখন তালেবানের এই মাত্রা ছাড়া সহিংসতার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে নয়া দিল্লিকে। ভারতীয় ফটোসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি কান্দাহারে সংঘর্ষে নিহত হওয়ায় এখন আরও চাপে সাউথ ব্লক।’

তালেবান নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ কাশ্মির। কাশ্মিরে মানবাধিকারের চূড়ান্ত লংঘন, গণহত্যা, নির্যাতন দিয়ে শান্ত হয়নি ভারত; নরেদ্র মোদির সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনও কেড়ে নিয়েছে। এমনকি রাজ্য হওয়া থেকেও

বঞ্চিত রেখেছে কাশ্মিরকে। কাশ্মিরি মানে সন্ত্রাসী- এই চিত্রই উঠে আসে ভারতের নাটক-সিনেমায়। ভারত এখন ভয় পাচ্ছে পাকিস্তানি তালেবানদের সঙ্গে মিশে আফগান তালেবানরাও কাশ্মির নিয়ে আগের চেয়ে বেশি নাক গলাবে। তাতে করে ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা অথবা তালেবানের কারণে কাশ্মিরে আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাবে।

আমেরিকা ভারতের এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি না এই সময়ে। রাশিয়াও ভারতকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তালেবান তাদের আশ্বস্ত করেছে সন্ত্রাস তাদের দেশের বাইরে গড়াবে না। তাই এ নিয়ে অহেতুক মাথা ঘামাতে চায় না মস্কো।

সম্প্রতি একটি ব্রিটিশ সংবাদপত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, তালেবান ক্ষমতায় এলে ব্রিটেন তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা করবে। ভারতের ধারণা, আফগান-পাকিস্তান নীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের সমর্থন রয়েছে পুরোপুরি ইসলামাবাদের দিকেই, যা ভারতের পক্ষে খুবই চাপের।সব মিলিয়ে ভারতের ঝুঁকি নিয়ে ভাবার মতো নয়া দিল্লির পাশে কেউ নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ  পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।
https://www.facebook.com/BangaliTimesofficel

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Bangalitimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com