সেন্টমার্টিনঃ বাংলাদেশের দক্ষিণের শেষ বিন্দু

ঘুরে ঘুরে ঘুরাঘুরি করতে করতেই এসে পড়লো ডিসেম্বর মাস। আর তাই দলবল পাকিয়েই ছুটলাম আরামবাগের পথে। আর ততোক্ষনে, আরামবাগের আরাম, হয়েই গেছে হারাম আর হবেই না বা কেন বলেন। উত্তরে পড়তে শুরু করেছে শীত আর তাই পরিযায়ী পাখির মত সবাই ছুটতে শুরু করেছে দক্ষিনে। আমরাও যে তার ব্যাতিক্রম নই। তাই আমরাও পথ ধরলাম দক্ষিনের। আগেই থেকে ঠিক করে রাখা সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাসে চেপে বসলাম। রাত ৮ঃ৩০ এর বাস যখন টেকনাফ ঘাটে পৌছুলো তখন ভোর ৬ঃ৩০। মানুষ বলে শীপ ছাড়ায় আগে আগেই এসে পৌছায় কিন্তু আমরা এসে পৌছেছি যে প্রায় সকাল হবারি আগে। যাইহোক ফ্রেশ হয়ে পেট পুজো করে নেয়ার পালা। করেই ধীরে সুস্থে ছুটলাম শিপ পানে। বসলাম চড়ে শিপে। ৯ঃ৩০ বাজতেই একে একে সব শিপ যাত্রা শুরু করলো গন্তব্য- সেন্টমার্টিন।

সময় করে ভার্চুয়াল একটি ট্যুর দিয়ে আসতে পারেন
🔰বাংলাদেশের দক্ষিণের শেষ বিন্দু (পুরো ট্যুর)
🔰https://youtu.be/LRBYUGYbqis

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যা মূলভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে এবং কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে ১৭ বর্গ কিলোমিটারের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। দ্বীপটি কবে প্রথম সনাক্ত করা হয়েছিলো তা জানা যায়নি। তবে প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরন করেছিলেন জিঞ্জিরা দ্বীপ নামে। এই বনিকরা চট্রগ্রাম থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের সময় এই দ্বীপে বিশ্রাম নিতেন। তাই মানুষ দ্বীপটিকে জিঞ্জিরা দ্বীপ নামেই চিনতো।
১৮৯০ সালের দিকে বাঙ্গালী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ এই দ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেন। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায় প্রথম অধিবাসী হিসেবে বসতি স্থাপন করেছিলো মোট ১৩ টি পরিবার। যারা সবাই মৎস্যজীবি বা জেলে ছিলো।

কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিণত হয়। সেখানে তারা প্রচুর পরিমানে নারিকেল গাছ রোপন করে। তাই একটা সময় নারিকেলে জিঞ্জিরা নামেও অবিহিত করা হয় দ্বীপটিকে। ১৯৯০ সালে ব্রিটিশ ভূ-জরীপ দল এই দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসেবে নিয়ে নেয়।

১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। তারপর থেকেই মানুষ এটিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপ নামেই চিনে।
দিনের আলো নিভে এলে, শুধুই যে জোয়ারের পানি বাড়ে তাই নয়। সেই সাথে সেন্টমার্টিন ও সেজে উঠে আলোকিত ঝলমল এক সাজে। সেন্টমার্টিন হলো শুটকি ও তাজা মাছ প্রেমিদের জন্য এক স্বর্গ। অগন্তি দোকান ভরা পাবেন নানান মাছের নানান ধাচের শুটকি। সেই সাথে জোয়ারের পানি ভেজা বিচের ধারেই অস্থায়ী দোকান গুলো পড়সা সাজিয়ে বসে নানান তাজা সামুদ্রিক মাছ নিয়ে। জাস্ট পছন্দ করেই দামাদামি করে ফেলুন। রেডি করে খাবার উপযুক্ত করে দেবার দায়িত্ব তাদের। ভরপুর মাছের বারবিকিউ খেয়ে অনেক রাতে ফেরার পালা রিসোর্টে। অপেক্ষা সকাল হবার।

সেন্টমার্টিন থেকেই পালা ছেঁড়াদ্বীপ যাবার। ছেঁড়া দ্বীপ হলো বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণের সর্বশেষ বিন্দু। দক্ষিণ দিকে এর পরে বাংলাদেশের আর কোনো ভূখণ্ড নেই। সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট কয়েকটি দ্বীপ রয়েছে, যেগুলোকে স্থানীয়ভাবে ‘ছেঁড়াদিয়া’ বা ‘সিরাদিয়া’ বলা হয়ে থাকে। ছেঁড়া অর্থ বিচ্ছিন্ন বা আলাদা, আর মূল দ্বীপ-ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন বলেই এ দ্বীপপুঞ্জের নাম ছেঁড়া দ্বীপ।
প্রবাল দ্বীপের ইউনিয়ন সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। দক্ষিণের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক পাথর। দ্বীপের প্রায় অর্ধেকই জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানিতে ডুবে যায়। এই এলাকাটি সরকারের ঘোষিত একটি ‘পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’। এরকম এলাকায় ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানায় জমি কেনা, এমনকি কোনো প্রকার স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ।

সেন্টমার্টিন থেকে যদি যেতে চান ছেড়াদ্বীপে, তবে বাই সাইকেল ও মোটরসাইকেলের কস্টকর জার্নি ছাড়া অন্য যে উপায়টি আছে তা হলো যেতে হবে সাগর পারি দিয়ে। আর সাগর পারি দেয়া যায় ৩ ভাবে। তুলনা মূলক সস্তা উপায় হলো ট্রলার যার যাওয়া আসার ভাড়া জন প্রতি ১৫০ টাকা। ট্রলারের তুলনায় তুলনামূলক দ্রুত ও নিরাপদ উপায় হলো লাইফবোট যাওয়া যায় ভাড়া ২০০ টাকা। আর দ্রুত গতিতে, অ্যাডভেঞ্চারময় যাত্রায় জন্য আছে জন প্রতি ৩০০ টাকায় স্প্রিড বোট। আমরা মূলত গিয়েছি লাইফবোটে এটায় যেতে ২০ মিনিট, ফিরে আসতে ২০ মিনিট সময় লাগে। এর মাঝে ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট সময় পাওয়া যায় ছেড়া দ্বীপের ব্যাপক ন্যাচারাল বিউটি গেলার।
ছেড়াদ্বীপ থেকে ফিরেই শেষ বারের মত ছুটে যাওয়া সেন্টমার্টিনের স্বচ্ছ নীল পানির সৈকতে। ছুটে চলা সময়কে সাক্ষী রেখে এবার পালা আদার ব্যাপারী হয়েও শিপ পানে ছুটে চলার। ফেরার পথ ধরার।

ধীরে ধীরে নিভে আসছে দিনের আলো। গাঙচিল গুলোও ফিরে যাচ্ছে বিদায় দিয়ে। এবার যে সত্যিই ফিরে যাবার পালা। ইট পাথরের জংগলের মানুষের আবারো ইট পাথরেই ফিরে আসা। অসাধারণ সেন্টমার্টিন ট্রিপ। নতুন করে দেখায় দেশ কে, জানায় কতটা ভাগ্যবান এই দেশের মানুষরা। তুচ্ছ এই জীবনের ছোট্ট একটা ট্রিপ। নতুন করে জানায়, নতুন করে শেখায় জীবনের মানে। ছোট্ট জীবনের সুযোগ পেলেই তাই ঘুরতে থাকুন, জানতে থাকুন, জানাতে থাকুন। কিপ রোমিং
ওহ ভাল কথা। ঘুরতে জান, ট্যুরে জান, ট্র‍্যাকিং এ জান। যেখানে মন চায় জান, যেভাবে মন চায় জান। কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছুই করবেন না প্লিজ লাগে। দিয়ে আসবেন পদচিহ্ন, আর নিয়ে আসবেন স্মৃতি। এর বেশি কিছুই নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

নন্দনকানন বললে আমাদের মাথায় কি এমন কিছু ছবি আসে??

Wed Apr 14 , 2021
নন্দনকানন বললে আমাদের মাথায় কি এমন কিছু ছবি আসে?? চারদিকে সহস্র জ্বলজ্বলে টিউলিপ ফুলগুলো যখন প্রথমবার দেখলাম শুধু মনে হলো কি অপরূপ সৃষ্টি!! এ যেন সত্যিই এক ফুলের স্বর্গরাজ্য। আর এই স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করতে আপনাকে কোন প্রবেশমূল্য দিতে হবেনা। এমনকি গাড়ি পার্কিংও ফ্রি। শুধু যাবেন আর চক্ষু মুদিয়া দেখবেন। টিউলিপের […]