যেখানে পথ চলতে হয় শত বছরের কবর পাড়িয়ে

প্রায় ৪০০ বছরের গৌরব এবং সমৃদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ঢাকা শহরের বেড়ে ওঠা। আর তারি জানান দেয় পুরান ঢাকা মিড ফোর্ট ও আরমানিটোলার মাঝে চার্চ রোডে অবস্থিত আরমেনিয়ান চার্চ টি।
বিঃদ্রঃ স্থানটি একটি কবর স্থান, কোন ঘুরার স্থান নয় তাই অধিকাংশ সময়েই সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না তাই যাবার আগেই বিস্তারিত দেখে নিতে পারেন।
🔰Armenian Church – আরমেনিয়ান গির্জা
🔰https://youtu.be/5anmtlsMpYI

আরমানিরা ঢাকায় যে অঞ্চলে বসবাস করত, কালক্রমে তার নাম হয়ে যায় আরমানিটোলা। মুসলিম শাসনামলে কিন্তু এই এলাকার নাম ছিল ‘আলে আবু সাঈদ’। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকা শহরে ৪০টির মতো আরমানি পরিবার ছিল। আরমানিটোলায় একটু গোছগাছ করে বসার পর আরমানিরা এখানে নির্মাণ করেছিল তাদের গির্জা। বর্তমানের এই এই প্রার্থনালয়টি ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় যদিও তার আগে থেকেই স্থানটি আরমেনিয়ান দের কবর স্থান ও প্রার্থনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। ঢাকায় বেড়াতে আসা ঐতিহাসিক পর্যটকরা তাদের নিয়ে ধোলাইখালের কাছে যে গির্জার কথা উল্লেখ করে গেছেন, তা-ই সম্ভবত এই আরমানি গির্জা। এখানে একটি কবরস্থান ছিল।

গির্জা নির্মাণের জন্য কবরস্থানের আশপাশের বেশ কিছু জায়গা দান করেছিলেন ‘আগা মিনাস ক্যাটচিফ’। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, গির্জাটি নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন চারজন আরমানি। তাঁদের নাম হলো মাইকেল সার্কিস, অক্টো-ভাট সেতুর জিভর্গ, আগা এমানিয়াজ ও মার্কার পগোজ। গির্জা উদ্বোধন উপলক্ষে মোটামুটি ছোটখাটো একটা উৎসবও হয়েছিল। আরমানিরা মিছিল করে ব্যান্ড বাজিয়েছিল।

চার্চটি লম্বায় সাড়ে ৭৫০ ফুট। চারটি দরজা এবং ২৭টি জানালা। ১৪ ফুট প্রশস্ত এক বারান্দা দিয়ে ঢুকতে হয় গির্জায়। দালানের ভেতরের মেঝে তিন ভাগে বিভক্ত, রেলিং দিয়ে ঘেরা একটি বেদি; মাঝখানের অংশে দুটি ফোল্ডিং দরজা; বেষ্টনী দিয়ে আলাদা করা তৃতীয় ভাগটিতে শুধু মহিলা ও বাচ্চারা বসে থাকে। প্রার্থনাকক্ষে একসঙ্গে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ প্রার্থনা করতে পারে। প্রার্থনাকক্ষের প্রধান প্রবেশদ্বারের একপাশে একটি সুদৃশ্য কাঠের সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে পাটাতনে ওঠা যায়। পাটাতনের দুই পাশের দরজা দিয়ে ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

আলাদা করে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্থূল বর্গাকার টাওয়ার। চূড়ায় আছে চারটি শঙ্খিল মিনার। চার দেয়ালের মাঝে, মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে দেয়ালে লাগানো আছে একটি মার্বেল ফলক। আরমানি ও ইংরেজি ভাষায় তাতে লেখা আছে—মি. সার্কিস ঈশ্বরকে উৎসর্গ করেছেন এই চমৎকার জাঁকালো মিনার।

গির্জাটিতে বেশ বড় আকারের একটি ঘণ্টা ছিল। এটি কবে স্থাপিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে জানা না গেলেও ১৮৪০ সালে ঢাকায় ঘুরতে আসা কর্নেল ডেভিডসন এই ঘণ্টা দেখেছিলেন। এটির আওয়াজ শুনে ঢাকাবাসী দিনের সময় নির্ধারণ করত। ঘণ্টাটি ঘড়ির সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বাজানো হতো। চার্চের ঘন্টাটিও বেশ নামকরা ছিল। নির্মাণ করেছিলেন জোহানসকাব্রু পিয়েত সার্কিস। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের আগে এই ঘণ্টার শব্দ চার মাইল দূর থেকেও শোনা যেত। উনিশ শতকের শেষের দিকে আরমানিরা গির্জার ব্যয় কমানোর জন্য ঘণ্টাবাদককে বিদায় করে দেয়। যেহেতু ঢাকাবাসী সময়ের ব্যাপারে এই ঘণ্টার ওপরই নির্ভর করত, তাই এটি বন্ধ করে দেওয়ায় জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ঢাকা প্রকাশ’ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
গির্জাটির চারদিকে রয়েছে পাকা করা অনেকগুলো সমাধি। অষ্টাদশ শতকের পুরনো কবরও আছে। বেশির ভাগ স্মৃতিফলকে মৃতের নাম এবং ধর্মগ্রন্থের বাণী উদ্ধৃত রয়েছে এবং একেকটি পরিবারের সদস্যকে একেক সারিতে সমাহিত করা হয়েছে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে টাওয়ারটি সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। আর্মেনিয়ান গীর্জাটিতে সুপরিচিত ইউরোপীয় শিল্পী দ্বারা আঁকা চার্চ বিশপের একটি তৈলচিত্র ছিল, কিন্তু প্রয়াত আর্কবিশপ সাহাক আয়ভাডিয়ান ১৯০৭ সালে উক্ত পেইন্টিং তার সাথে করে নিয়ে যান। গীর্জার বারান্দা হতে শুরু করে চারপাশ জুরেই রয়েছে শতবর্ষী শত শত কবর।

গীর্জায় অবস্থিত শতবর্ষী কবর গুলোর মধ্যে পুরানো একটি কবর ক্যাটাকিক এভাটিক টমাসের কবর। কবরের উপরে কোলকাতা থেকে কিনে আনা তার স্ত্রীর অবয়বের আদলে তৈরী মূর্তি এবং কবরে লেখা ‘শ্রেষ্ঠ স্বামী’ শব্দটি জানান দেয় ভালোবাসার মানুষকে হারানোর বেদনা কতটুকু। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ঢাকা ভিজিটের সময় মাদার তেরেসা এই চার্চ প্রাঙ্গনেই থেকে ছিলেন।
যাইহোক, ঘুরতে যান ট্যুরে যান, ট্র‍্যাকিং এ যান, যেখানে মন চায়, যেভাবে মন চায় যান। কিন্তু প্লিজ লাগে, প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর এমন কিছুই কইরেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

সাহেরখালী বেড়িবাঁধে নতুন ‘মিরসরাই সি-বিচ’

Wed Apr 14 , 2021
অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা মিরসরাই। ঝর্ণার ক্ষনিও বলা হয় মিরসরাইকে! একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সাগর। আর ভ্রমণপিপাসুরা চায় এমনই একটি স্থান। আঁকা বাঁকা পথে পাহাড় ভ্রমণ কিংবা সাগর। কোলাহল মুক্ত এমননি একটি সাগরের খোঁজে ছুটে চলেন ভ্রমনপিপাসুরা। উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় সি-বিচে আবিস্কার করছে স্থানীয় ভ্রমণপিপাসুরা। যা ইতোমধ্যে “মিরসরাই সি-বিচ” নামে […]