বৃহস্পতিবার, ২৪ Jun ২০২১, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো রেমিট্যান্সের অর্থ ?

কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো রেমিট্যান্সের অর্থ ?

কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো রেমিট্যান্সের অর্থ ?

গোটা বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। আর এর মধ্যেই পরিবার-পরিজনের কাছে বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ সময়ে বিশ্বের অনেক দেশে প্রবাসী আয় কমলেও সেখানে বাংলাদেশ এক ব্যতিক্রম সমুজ্জ্বল। করোনা সংকট কালীন সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে প্রবাসীরা এপ্রিল মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে যার পরিমাণ ২০৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা। আগে কোন একক মাসে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। গত বছরের এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল মাত্র ১০৯ কোটি ২৯ লাখ ডলার। সাধারনত রমজান মাস ও ঈদ উপলক্ষে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়। তবে এবারের প্রবৃদ্ধি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রেমিট্যান্সের এ বড় প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদস্বরুপ। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই,২০ – এপ্রিল,২১) ২ হাজার ৬৭ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থ বছরের চেয়ে প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে রেমিট্যান্সের এত প্রবৃদ্ধি আগে কখনো হয়নি। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরেও এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। নগদ প্রণোদনার জাদুতেই করোনার মধ্যেও রেমিট্যান্সের উর্ধ্বগতির ধারা বজায় রয়েছে। রেমিট্যান্সের উপর ভর করেই বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের এক সূত্র থেকে জানা গেছে যে, বর্তমানে ১৭৪ টি দেশে বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত রয়েছে, অঙ্কে যার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি।
২.
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের এই কষ্টার্জিত অর্থ ? এ ব্যাপারে মানুষের একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আসলে এর সবটাই কি ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে ? কিছুই কি সঞ্চয় হিসেবে থাকছে না ? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এর কিছু তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে যে, প্রবাসী রেমিট্যান্স আয় বাবদ খাদ্য ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যে বিনিয়োগ হয় তার বেশিরভাগই যায় অনুৎপাদনশীল খাতে। অর্থাৎ মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে ৭৪.৬৮ শতাংশই কোন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়না। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, কাপড়চোপড়, তেল-সাবান, বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য থেকে শুরু করে নানা বিলাসী পন্য যেমনঃ ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাট, সোফাসেট সহ নানা সামগ্রী। বাকি ২৫.৩২ শতাংশ অর্থ পরোক্ষভাবে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ হয়। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ অর্থ জমিজমা, ফ্ল্যাট কেনায় ও বাড়িঘর নির্মাণে ব্যয় হয়।
৩.
গত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় রোজা ও ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। যদিও ঈদের পরের মাসে তা আবার কমে আসে। ঈদের সময় যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে তার বেশির ভাগ অর্থাৎ ৯০ শতাংশই ব্যয় করা হয় ভোগবিলাসে। বছরের অন্য সময় অবশ্য বিলাসিতায় এতোটা খরচ হয়না। পরিসংখ্যান জরিপে আরো উঠে এসেছে যে, প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার প্রাপ্ত অর্থ থেকে কমবেশি সঞ্চয় করে থাকে। এধরণের পরিবারের গড় হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। তবে বিভাগ ওয়ারী এ হার ভিন্ন ভিন্ন। যেমনঃ প্রবাস আয় থেকে সঞ্চয় করে এমন পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে কম সিলেটে। বরিশালে এ হার সবচেয়ে বেশি। আবার যারা ঋন নিয়ে প্রবাসে গেছেন ওই পরিবারগুলোতে সঞ্চয়ের সুযোগ তূলনামূলকভাবে কম।
৪.
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। কিন্তু তাদের ঘাম ঝরানো এ আয়ের বড় অংশই ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আর বিনিয়োগ বলতে যা বুঝায় তাহলো জমিজমা কেনা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ। অর্থাৎ প্রবাসী আয়ে এমন কোন বিনিয়োগ হয়না যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়। প্রবাসীদের এ রেমিট্যান্স আয় যদি পরিকল্পিত ভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যেত তাহলে আমাদের অর্থনীতি আরো দ্রুত এগিয়ে যেত। কাজেই আহরিত রেমিট্যান্স বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার অবশ্য ইতোমধ্যে কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রবাসী পরিবারগুলো তাদের বেসিক চাহিদা মিটানোর পর হাতে যে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে তা যাতে তারা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারে সে লক্ষ্যে আরো কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
ড. ইউসুফ খান
১৮ মে, ২০২১

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Bangalitimes.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com